বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে কি আসলেই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে? মানুষ কি সত্যি ভুলে গেছে তার অতীত? আমাদের দেশের গৌরবময় ইতিহাস কি এখন আর কাজ করছে না? বর্তামন প্রজন্ম নামে পরিচিত তারুণ্য কি আসলেই ভুলে যেতে চাইছে আমাদের ইতিহাস? এই প্রশ্নগুলো এখন আগুনের মতো সামনে দাঁড়িয়ে যা অস্বীকার বা এড়িয়ে চলা যাবে না। কোন দেশ বা দেশের জনগণ মন চাইলেই স্বাধীন হতে পারে? না তা সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কোন কথা হবে না, এটাই সত্য হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হয় নি। আমরা বস্তাপচা রাজনীতির কাছে না গিয়ে বরং বৈশ্বিক দিকে তাকাই। দেখব, বহু ধরনের বাধার দেয়াল সরে গেছে। একেবারে হাতের মুঠোয় এসে গেছে পৃথিবী। কিন্তু এখানেই আমাদের সমস্যার শুরু। ইনফরমেশন বা তথ্য পাওয়া ভালো কিন্তু কোন তথ্য ঠিক আর কোনটা অসত্য সে ব্যবধান এখন নির্ণয় করা কঠিন। আমার ধারণা এই ফাঁদে পড়েছে নতুন প্রজন্ম।
তাদের মনোজগত বোঝার পরিবর্তে বিরোধিতা করা কোন কাজের কাজ হতে পারে না। কিন্তু দুই দশক ধরে সেটাই করে গেছি আমরা। একটা কথা মনে রাখা দরকার জীবনের প্রতি বাঁকেই জীবন রং বদলায়। তার ধারণা পরিবর্তিত হয়। সত্তর দশকে আশির দশকে একখানা খবরের কাগজই ছিল যথেষ্ট। মানুষ মুদ্রিত প্রতিটি শব্দকে মানতো। মনে করতো বেদ বাক্য। আশির দশকের শেষে সে জায়গা নিলো সাদাকালো টিভি সে বোকা বাক্স তখন তথ্যের ভান্ডার। একটা বাক্স শব্দ করে আবার ছবি দেখা যায় এ কি কম কথা? রেডিও গেলো অস্তাচলে। সে প্রবাহ বেশীদিন টিকলো না। আসলো ডিভিডি ক্যাসেট অত:পর এখন ইউ টিউব ইনসটাগ্রাম আর ফেইস বুক। মানুষ নিজেই হয়ে উঠলো এক একটা মিডিয়া। আসলে কি হলো? একটা মোবাইল হাতে থাকা মানেই মানুষ মনে করলো সে ও পারে। ছবি তুলে পোস্ট দিতে লাগে কয়েক মিনিট। ব্যস শুরু হয়ে গেলো প্রতিযোগিতা। দেশ বিদেশে অসুন্দর অস্বাভাবিক এই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লো যুব সমাজ। বয়স্করা দায় দায়িত্ব ভুলে লেগে থাকলেন এনজয়মেন্ট নামের নীল প্রবাহে। কী দাঁড়ালো?
মানুষে মানুষে তৈরী হলো ভয়ানক দূরত্ব। ঘরে ঘরে মানুষ হয়ে পড়লো একা। ছেলেমেয়েরা কথা বলে না। স্বামী স্ত্রী দিনরাত একসাথে থেকেও নাই। সবার মন আর হাতের মুঠোয় বিনোদন আর অশান্তির ছোট পর্দা। এর ভালো দিকগুলো মুছতে শুরু করলো। ভয়ংকর যেটা , যে কোন ইতিহাস ভূগোল বা বিজ্ঞান জানে না পড়ে না সে ও বুঝতে পারলো সবকিছু সম্ভব। গুগোল হাতড়ালেই দুনিয়া জানা যায়। এই ভ্রান্তি আমাদের তিনটা জিনিস কেড়ে নিয়েছে।
এক) মানুষের স্মৃতির ওপর বিশ্বাস কেড়ে নিয়েছে। যে কারণে এখন আর মগজের ব্যবহার নাই হিটলারের মৃত্যুদিন বা লেনিনের জন্মদিন কিছু জানতে হলে গুগোলে গেলেই হয়।
দুই। আত্মবিশ্বাস হয়ে গেছে নড়বড়ে। আগে অগ্রজ বা বড়রা বললে ছোটরা শুনতো। এখন শুনলেও কি করে? এক ফাঁকে গুগোল খুলে দেখে নেয় অগ্রজ মানুষটি সত্যিই বললেন না ভুল? অথচ এরা জানে না গুগল উইকিপিডিয়া সব মানুষের বানানো। সে বা যারা যারা পুরে দিয়েছে সেটাই উগরে দিচ্ছে এ দুই মিডিয়াম। মাঝ্খান থেকে অগ্রজদের কপালে এসেছে দুর্ভোগ।
তিন. ঐক্যহীনতার জন্ম দিয়েছে এই অবাধ তথ্য প্রবাহ । ধর্ম বা বিশ্বাস ভেদে ভিন্ন পোশাক ভিন্ন খাবার ভিন্ন সংস্কৃতির ভেতর যে ঐক্য তা আজ প্রায় নি:শেষ হবার পথে। হিন্দুমুসলিম খৃষ্টান নির্বিশেষে কে কা‘কে অনুসরণ করে পুরা ধার্মিক হবে সে প্রতিযোগিতায় তারুণ্য আজ দুর্বিপাকে। এর কুফল আমরা দেখছি আমাদের স্বদেশে।
এখানে একটা কথা বলা দরকার যে সমাজ যতো পশচাৎপদ যাদের জীবনে অশিক্ষা কু শিক্ষা বেশী তাদের দুর্ভোগ অধিক। বাংলাদেশের মানুষের মনোজাগতিক বিকারে এর ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। যে যুবসমাজ আজকে দেশে দাপট দেখাচ্ছে বা দেশ পরিচালনা করার মতো জায়গায় পৌঁছে গেছে তার কোন রাজনৈতিক ইতিহাস নেই। নাই কোন অভিজ্ঞতা। যা তারা করেছে বা করছে তার নাম ঐ ডিজিটাল বিপ্লব। যে ডিজিটাল দুনিয়া বাস্তবে অস্তিত্বের সংকটে তা প্রতিনিধি কি ভাবে সমাজ সংহত রাখবে?
প্রশ্ন হচ্ছে বিজ্ঞ সুশীলেরা এসব বুঝলেন না কেন? আমি মনে করি অন্ধ স্তাবকতা আর পাওয়ার গেইমের কারণে অন্তঃসার শূন্য স্বদেশ আজ হাহাকার করলেও কেউ শুনছে না। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ নগরে আধুনিকতার ছোঁয়া নাই। আছে দর্শনীয় কিছু স্থাপনা আর যোগাযোগ। এগুলো দরকারি। কিন্তু বহিরাঙ্গিক প্রস্তুতি যদি অন্তরকে ধারণ না করে তো আমাদের মুক্তি মিলবে কিভাবে?
বাঙালি যুব সমাজে ধর্ম অধর্ম আর সংস্কৃতি বিরোধিতা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যার নিরাময় না হলে দেশ এগুবে না। এখন রাজনীতি না চাইলেও এসে পড়বে। দেশপ্রেমিক সংজ্ঞাটি যে যার মতো করে দিতে ভালোবাসবেন এটাই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের জয়ী দল যাদের দেশপ্রেমিক মনে করবে পরাজিতরা তাদের তা মনে করবে না। তাই মীমংসাটা সময়ের হাতে ছেড়ে না দিয়ে ইতিহাস শুদ্ধ করার প্রক্রিয়াগুলো করা উচিৎ ছিল। তার চেষ্টা ছিল কিন্তু ফল মেলে নি।
এখন সময় কঠিন। এই তারুণ্য একবার যখন অমৃত অথবা বিষের পেয়ালা হাতে পেয়ে গেছে তা হাতছাড়া করতে চাইবে না। আরো যেটা ভয়ের বিভক্তি পৌঁছে গেছে চরম পর্যায়ে। এই বিভক্তি দেশে বিদেশে আমাদের কাল না হয়ে দাঁড়ালেই ভালো হবে। যে কথা বলছিলাম মনোজাগতিক পরিবর্তনে প্রেম নাই। সুন্দর নাই। বিরহ নাই। গান নাই। এমনকি বিদেশের ভালো ছবি বা যৌনতাও নাই। আছে বিকৃতি আর বিদ্রোহের নামে মারদাঙ্গা। আপনি কথা গলার স্বর আর উ্ল্লাসেও তা খুঁজে পাবেন। তবে যে কোন ন্যায় সঙ্গত বিদ্রোহে তারুণ্য ই আমাদের শক্তি যা তারা বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে। আমি তারুণ্যের সদার্থক গুণগত পরিবর্তন মনোজাগতিক বদলে যাওয়াকে স্বাগত জানাই। এটি জীবনের নিয়ম। না বদলালে মানুষ পঁচে যায়। পচা মানুষের মন দিয়ে ভালো কিছু অর্জন করা যায় না। কিন্তু সবকিছু হতে হবে প্রকৃতি ও জীবনের নিয়মে। কলসী উল্টে পানি পান করতে হয় কিন্তু কলসী আছড়ে ফেলে বা ভেঙ্গে ফেললে পানি পান অসম্ভব ।
মনোজাগতিক শুদ্ধতার প্রয়োজন এখন জরুরি।
লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক।












