দূরের দুরবিনে

ভাষার মাস ভরসার মাস

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ ও বাঙলির জীবনে ফেব্রুয়ারি মাসটি গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসকে আমরা বলি ভাষার মাস। সত্তর বছরের ও আগে আমাদের দেশের তারুণ্য মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করে যে ইতিহাস রচনা করে গেছেন আজ তা কিংবদন্তী। কিন্তু ভাষার মাস বলে যতই আমরা তৃপ্তি লাভ করি না কেন আজ এই ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার যে চেহারা দেখছে তা কি সত্যি আমরা চেয়েছিলাম? এ প্রসঙ্গে যাবার আগে ফেব্রুয়ারি বিষয়ে বলতে চাই । এই মাসের মাঝামাঝি সময়ের একটি দিন বিশ্বজুড়ে ভালোবাসা দিবস নামে পালিত হয়। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আর যে কোন দিবসের চাইতে ভালোবাসা দিবসকে জরুরী মনে হতেই পারে।

ভ্যালেনটাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস যে কেন জরুরি তা বলে বোঝাতে হবে না। এই ভালোবাসা বিষয়টা এখন স্থুল ভাবে ব্যবহৃত হয় বলে আমরা ভুলে যাই দুনিয়ার বহুদেশে ভালোবাসা নাই বলে মানুষ শান্তিতে নাই। গাজা বা ফিলিস্তিনের জন্য যেমন ভালোবাসার প্রয়োজন তেমনি দরকার ইউক্রেনের যুদ্ধপীড়িত মানুষের জন্য।ভেনেজুয়েলা বা ইরানের জন্য ভালোবাসার বিকল্প কোথায়? আর আমাদের স্বদেশ? যার প্রতি অঙ্গে ভাঙচুর তার দরকার ভালোবাসা। সেই কবে দুঃখিনী বাংলাকে ভালোবেসেছি আমরা, আজ তার প্রগতি উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রা থমকে আছে। তার শহর বন্দর গ্রামে খালি তর্ক আর তর্ক। বিদ্রোহ আর মারামারি যে এক না তাও ভুলতে বসা বাঙালির ভালোবাসা বড় দরকার।

বলছিলাম ভাষার কথা। মানুষের ভাব প্রকাশের বাহন ভাষা। আমি খুব অবাক হয়ে দেখি যে কোন উন্নত বা সভ্য সমাজে মানুষ অবলীলায় তাদের ভাষার শুদ্ধরূপ বলতে বা লিখতে পারে। অনেক কষ্ট আর ত্যাগের ফলে নির্মিত হয় ভাষার ব্যবহার। আমাদের বাংলা ভাষা রক্তস্নাত হবার পরও আমরা সে শুদ্ধতা বজায় রাখতে পারছি না। এর পেছনের কারণগুলো অজানা নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ্‌ বিষয় হচ্ছে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভাষার বিকৃতি। আঞলিক কথাবার্তা মানুষের ভাষার মৌখিক রূপ। সেটা তারা লিখে না। অথচ এই বলার ভাষার নামে আমাদের নাটক সিনেমা গানে কবিতায় এমন সব বিকৃতি চলছে যা একদিন হয়তো প্রমিত বাংলাকেই ঢেকে ফেলবে। ভয়ের এই দিকটা আগলে রাখছে সস্তা রাজনীতি। একদিন আরো অনেক কিছুর মতো রাজনীতি আমাদের ভাষাকে গিলে ফেলতে পারে এই ভয় অমূলক মনে হচ্ছে না।

রাজনীতির কথাই যখন আসলো এই ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ পেতে চলছে নির্বাচন। সব ঠিক থাকলে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান আমাদের জাতির জন্য অন্য এক মাত্রা বয়ে আনার কথা। গণতন্ত্র বা জনগণের ইচ্ছা আমাদের সমাজে পদদলিত থাকে এটাই নিয়তি। আমি এখন যে দেশের নাগরিক সে দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ভোট দান বাধ্যতামূলক। তবে হ্যাঁ আপনি ভোট না দিতেও পারেন। যদি আপনার অঢেল টাকা থাকে এবং জরিমানা দিতে ইচ্ছা হয় আপনি ভোট না দিলেও চলবে। যুক্তিযুক্ত কারণ আর তথ্য প্রমাণ ছাড়া ভোট না দেয়া এদেশে অপরাধতুল্য। ভোট আমরা দেই। লম্বা ব্যালট পেপারে সব দল ও মতের প্রার্থীর নাম থাকে । সবাইকে টিক চিহ্ন দেয়া জরুরী। না হলে ভোট বাতিল হতে পারে। সবাইকে টিক দিলে আপনার মনোনীত বা সমর্থিত প্রার্থী জিতবে কি ভাবে? জিতবে। কারণ আপনি ভোটে তাকে এক নাম্বারে রাখবেন। বাকীরা টিক পাবে পরের নাম্বার গুলো অনুযায়ী। মনে করেন দশজন প্রার্থী। আপনার অপছন্দ বা বিরোধীকে আপনি রাখবেন ১০ নাম্বারে। কিন্তু কাউকে না বলা যাবে না। এই যে জাতীয় সমঝোতা বা সহনশীলতা এর কারন হচ্ছে এদেশে কেউ অস্ট্রেলিয়া বা দেশ বিরোধী রাজনীতি করে না। বা এখানে কোন দল বা প্রার্থিকে অমুক দেশের দালাল বা অমুক পন্থী বলে ডাকার রেওয়াজ নাই। একারণেই আমরা বারবার বলে আসছি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতার প্রতি অনুগত সকল রাজনৈতিক দলই বৈধ। বাকীরা রাজনীতি করতে চাইলে এই তিন সত্য মেনে আসুক।

আর একটা মজার বিষয় হচ্ছে কোন অমোচনীয় কালি নাই এদেশে। আঙুলে কালি লাগানোর নিয়মও নাই। আছে কাঠ পেন্সিল। প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে পেন্সিলের ব্যবহার দেখে হতাশ ও বিস্মিত হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি একদিকে সাশ্রয় আরেকদিকে আছে বিশ্বাস। বিশ্বাসটা এই, কেউ জাল জালিয়াতির কথা চিন্তাও করে না। পেন্সিলের দাগ হলেও ভোট যার তার ই থাকবে। উদার গণতন্ত্রে অবাধ স্বাধীন ভোটে এটাই নিয়ম।

মানতেই হবে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারেন নি। তাদের ভোট দিতে দেয়া হয় নি। পাওয়ারফুল শাসক আর তাদের দল ধরে নিয়েছিলেন এই দেশে যে ভাবে ইচ্ছা দেশ শাসন করা যায়। যত উন্নতি অবনতি দুঃশাসন আর ভালো দিক থাক না কেন জনগণের ভাষা বুঝতে না পারার কারনে আজ তাদের বিদায় নিতে হয়েছে। উধাও হয়ে গেছে সবচাইতে বয়সী প্রাচীন দলটি। এই ফেব্রুয়ারি তাদের জন্য ভয়াবহ এক শিক্ষার মাস। জনগণ যে কতটা শক্তিশালী বা নিয়ামক সেটা বুঝতে না পারলে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে হয় না।

বলছিলাম এই মাসটি এবার আশা হতাশা আর দ্বন্দ্ব উত্তরণের এক মাস। ভাষা বিকৃতি রোধ করতে না পারলে বাংলা ভাষার গৌরব হাতছাড়া হতে বাধ্য। আমাদের এই প্রিয় ভাষা পাশের বঙ্গে হিন্দির কবলে পড়ে ক্লিশ। আর আমাদের সমস্যা জগাখিচুড়ি। প্রয়াত অধ্যাপক লেখক সৈয়দ মনজরুল ইসলাম লিখেছিলেন: ‘ভাষা দূষণ নদী দূষণের চাইতেও ভয়াবহ।’ মনে রাখা প্রয়োজন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ভাষার কারণে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারীর হাত ধরেই এতদূর এসেছে এই দেশ। ভালোবাসা নির্বাচন আর ভাষার সম্মান এই তিনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা স্বদেশের চোখে মুখে উদ্বেগ। অশান্তি আর অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বারবার স্বপ্ন দেখা স্বপ্ন দেখানো একটি জাতির ভাগ্যে আসলে কী আছে ঠিক এখন ই তা বলা যাবে না। তবে কবির কথায় বলি: এদেশে আসে না ফাগুন আসে যে ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশ ও তার মানুষের কল্যাণ হোক।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদ্বিতীয় বিয়েতে শালিশি কাউন্সিলের অনুমতি প্রয়োজন
পরবর্তী নিবন্ধবাঁশখালী উত্তর গন্ডামারা মুহাম্মদীয়া মাদরাসার মাহফিল