দূরের দুরবিনে

জাতিসংঘ কী জেগে আছে?

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে রুজভেল্ট ও চার্চিল হোয়াইট হাউসে মিলিত হন। এই বৈঠককে আর্কেডিয়া সম্মেলন বলা হয়। রুজভেল্টই প্রথম মিত্রশক্তিগুলোকে বোঝাতে “জাতিসংঘ” নামটি ব্যবহার করেন। চার্চিল এই নামটি মেনে নেন। ১৯৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর রুজভেল্ট, চার্চিল ও হ্যারি হপকিন্স মিলে জাতিসংঘের ঘোষণার খসড়া তৈরি করেন। এতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু প্রস্তাব রাখা হয়। তবে ফ্রান্সকে এতে কোনো ভূমিকা দেওয়া হয়নি। আগের আটলান্টিক সনদের তুলনায় নতুন একটি বিষয় যোগ করা হয়ধর্মীয় স্বাধীনতা। রুজভেল্টের অনুরোধে স্টালিন এতে সম্মতি দেন।

এর আগের একটা ঘটনা না বললেই নয়। গল্প হলেও এর ঐতিহাসিক মূল্য আছে । ইংল্যান্ড মোটামুটি ধরে নিয়েছিল যে তার পতন তখন সময়ের ব্যাপার। বারবার চেষ্টা করেও হিটলার বাহিনীকে থামাতে পারে নি তারা। দেশের পর দেশ জয় করা বিলেত দেশটি তখন ভয়ে কাঁপছে। তাদের ইজ্জত সম্মান তো বটেই স্বাধীনতাও বুঝি যাবার পথে । তখন আটলান্টিক পাড়ে সদ্য গজিয়ে ওঠা আমেরিকা আনকোরা এক নতুন দেশ। যার নাম শুনলেও তেমন কেউ চেনে না। কিন্তু এটা বোঝা হয়ে গেছিল যে ঐ নতুন দেশটি তৈরী হয়ে আছে। তার শক্তি ও সহযোগিতা ছাড়া হিটলার দমন অসম্ভব। একদিকে রাশিয়া অন্যদিকে আমেরিকা এরাই পারবে শত্রু দমন করতে। কথিত যে চার্চিল আর রুজভেল্টের বৈঠকে রুজভেল্ট চার্চিলকে প্রস্তাব দেন তারা সহযোগিতা করবেন এক শর্তে। ধীর ধীরে ইংল্যান্ড সাম্রাজ্যকে গুটিয়ে নিতে হবে পরাধীন দেশগুলোকে দিতে হবে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা। এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় কী দূরদর্শি ছিলেন আমেরিকার এই প্রেসিডেন্ট । আশি বছর আগে বুঝেছিলেন তারাই হতে যাচ্ছেন পরাশক্তি। চার্চিলের কাছে এই প্রস্তাব মানার বাইরে আর কোন উপায় ছিল না। তিনি তা মেনে নেন এবং তাঁর দেশের পরবর্তী নির্বাচনে পারজিত হন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে ১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে একটি সাধারণ যুদ্ধ বিরতির আহবান জানায়। এর প্রেক্ষাপটে উডো উইলসন তাঁর বিখ্যাত চৌদ্দ দফা পেশ করেন।উইলসন তাঁর চৌদ্দ দফা শর্তের ১৪ নং দফায় বিশ্ব শান্তি রক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ জুন, ১৯১৯ সালে স্বাক্ষরিত ‘ভার্সাই চুক্তি’র মাধ্যমে লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জের জন্মহয়। ১০ জানুয়ারি, ১৯২০ সালে সংস্থাটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। জাতিপুঞ্জের ৩টি অঙ্গসংস্থা ছিলপরিষদ, কাউন্সিল এবং সচিবালয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০ এপ্রিল,১৯৪৬ সালে সংস্থাটি বিলুপ্ত হয়। সংস্থাটির উত্তরসূরি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের জন্ম হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর ১৯১৯ সালে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়েছিল, তার ব্যর্থতা এবংদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বিশ্বের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিকসংস্থা গঠন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

সেই জাতিসংঘ হয়ে ওঠে একটি স্বীকৃত বিশ্বসংস্থা। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও তার ভূমিকার কথা বলতে হবে। সে ইতিহাস অম্লমধুর। ভারত রাশিয়া আর বাংলাদেশ সহ কিছু দেশ একাট্টা হয়ে মরিয়া চেষ্টা চালালেও পাকিস্তান পাচ্ছিল আমেরিকা আর চীনের পূর্ণ সমর্থন। তাদের ভেটো পাওয়ারের কারণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়া। কিন্তু একসময় সবাই হার মানলে ভূট্টো সাহেব সবার সামনে কাগজপত্র ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবার মতো ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। জাতিসংঘ মেনে নিয়েছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

আজকের জাতিসংঘ অনেকটাই একমুখি। তার অভিভাবক আমেরিকার বাইরে পা ফেলতে পারে না সে। উন্নয়ন বা জাতিগঠন সহ নানা বিষয়ে সাহায্য সহযোগিতা অব্যহত থাকলেও যুদ্ধ বা সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ এখন অকেজো প্রায়। সেই অতীতের বাঘা জাতিসংঘ অনেকটাই বেড়ালে পরিণত হয়ে গেছে । ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সমর্থনে কিংবা রাশিয়াকে প্রয়োজনীয় নৈতিক সমর্থন ও দিতে পারে না । জাতিসংঘের চাবিকাঠি আমেরিকা আর ইউরোপের হাতে । তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছাই এখানে চূড়ান্ত।

ইরানের ব্যাপারে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নময়। ভেনেজুয়েলা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর ও তেমন কোন উচ্চবাচ্য দেখা যায় নি। ইরানের কথায় আসি। কোন দেশে সরকার পতন হবে বা কারা দেশ চালাবে সেটা সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু সবার আগে মানুষের জীবন ও সম্পদ।

সম্পদের কথাতো বাদ ই দিলাম পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারার পর ও জাতিসংঘের ভূমিকা দেখি না। একটি সংস্থা যার জন্ম হয়েছিল যুদ্ধ বন্ধ আর শান্তির জন্য তার এই দুর্দশা মানা কষ্টকর।

যদি মানবিকতার কথা বলি রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার কথা আসবে। মানবিক ত্রাণ আর সাহায্যের বাইরে সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ কি সফল? মোটেও নয়। মহাসচিবের আগম নির্গমন ঘটনা হলেও সমস্যা যায় নি। যায় না। ফলে আমাদের এ কথা মানতেই হবে হয়তো এই সংস্থা তার সবলতা হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো তার কাঠামো আর দর্শন আগের মতো কাজ করছে না। ফলে নতুন ভাবে চিন্তার সময় উপস্থিত।

জাতিসংঘ ব্যর্থ হলে সারা বিশ্বের মানুষের লোকসান। তাদের ভরসার জায়গা নড়ে গেলে এইসব হানাহানি কমবে না। উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা এককালে জাতিসংঘের আগমন ও ভূমিকা মানেই যুদ্ধ বন্ধের ঈঙ্গিত ছিল। সে ভরসা এখন অস্তমিত। যার মূল কারণ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বেচছাচারী মনোভাব অথচ জাতিসংঘের মূল কাজ ছিল এমন একক আধিপত্যের হাত থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখা।

দেখে শুনে ছড়াকার ফারুক হোসেনের ছড়াটির কথা মনে পড়ছে: যুদ্ধে যুদ্ধে মলিন বিশ্ব / ভাঙচুর সারা অঙ্গ/ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটায় / নিরুপায় জাতিসংঘ।

আমরা এমন একটা জাতিসংঘ চাই যার ডাকে শান্তি নামবে। যুদ্ধ থামবে। যার প্রতি বিশ্বাস আর সম্মান থাকবে সবার। কারো অঙুলি হেলনে চলবে না এই সংস্থা। আজকের বিশ্ববাস্তবতায় এটা অত্যন্ত জরুরি। এ না হলে মানুষ ভরসা হারাবে। মানুষের জন্যই রাষ্ট আর মানুষের ভালোর জন্য ই জাতিসংঘ।

লেখক : সিডনি প্রবাসী প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্মরণ : দেশপ্রেমের বাতিঘর বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী
পরবর্তী নিবন্ধহযরত বায়েজিদ বোস্তামীর (রা.) বার্ষিক ওরশ ৩১ জানুয়ারি