দুবাই কী নিরাপদ? প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন

| মঙ্গলবার , ১৭ মার্চ, ২০২৬ at ১২:০৪ অপরাহ্ণ

বজ্রের শব্দে কেঁপে উঠল অ্যাপার্টমেন্টের জানালাগুলো। আমরা লাফিয়ে উঠে দৌড়ে বারান্দায় ছুটলাম। হাতে ক্যামেরা। ভাবছি কোনো যুদ্ধবিমান বা ইরান থেকে ছুটে আসা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের শব্দ। খবর বিডিনিউজের।

কিন্তু যখন বুঝলাম এটা দুবাইয়ের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো আরেকটি সুপারকারের গর্জন, আকাশচুম্বী ভবনগুলোর গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে যার শব্দ কান ঝালাপালা করে দিয়েছে, অনেকটা নির্ভার হলাম। ক্যামেরাম্যান মার্ক জারভিস ও আমি সংযুক্ত আরব আমিরাতে যে ১০ দিন ছিলাম সেসময় বহুবার এমনটা ঘটেছে, বলেছেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভির জন রে।

তিনি বলছেন, বিশ্বের অন্যতম ধনী শহর দুবাই যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্য দিয়ে গেছে একদিকে আগুন জ্বলছে, অন্যদিকে স্বাভাবিক জীবনযাপন অব্যাহত রাখার মরিয়া চেষ্টাও চলছে। সামনে আগাও, এখানে দেখার তেমন কিছু নেই সম্ভবত এখন তাদের সরকারি মন্ত্র। সারাবিশ্ব থেকে যাওয়া পর্যটক, ব্যবসায়ী আর প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় এই সুনামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের দুবাইয়ের সমৃদ্ধি।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলযুক্তরাষ্ট্রের এবারের যুদ্ধ, উপসাগরের অল্প পথ পেরিয়ে আসা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রে ওই ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে। মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া যে কোনো জায়গাকে বৈধ নিশানা হিসেবে দেখা ইরান আশপাশের যত দেশে হামলা চালাচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টায় তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা তার ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও করা লোকজনকে ভয়াবহ শাস্তি, বড় অঙ্কের জরিমানা এমনকি প্রয়োজনে জেলে পাঠানোরও হুমকি দিয়ে রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতায় কয়েকদিন আগেই শহরের ওপর দিয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ভিডিও করায় কঠোর সাইবার অপরাধ আইনে ৬০ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়।

এর সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি হুট করে যুদ্ধের মুখে পড়ে তড়িঘড়ি দেশে ফেরা ব্রিটিশদের শঙ্কামিশ্রিত সাক্ষ্য যোগ করার পর দুবাইয়ে আসলে কী হচ্ছে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা শুরু হয়। এক ধরনের ধারণা তৈরি হয় যে গণমাধ্যম বোধহয় পুরো চিত্র হাজির করছে না, মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি এবং দুবাই এখন থেকে আর নিরাপদ নয় এমন ভাবনা ছড়াতে শুরু করে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পরদিন দুবাই পৌঁছানো যুক্তরাজ্যের সাংবাদিকদের একজন জন রে তেমনটা দেখেননি। আমরা দেখতে পাই ভীতসন্ত্রস্ত এক শহর, এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছে যেটা ভাবেইনি কেউ, কীভাবে শেষ হবে তাও অজানা।

কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা আড়াল করা হচ্ছে বলে যে জল্পনা তার সপক্ষে কিছুই দেখিনি আমরা, বলেছেন তিনি। এর একটা কারণ হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা, বিপুল বিনিয়োগ করলেও এই ব্যবস্থা যে শেষ পর্যন্ত বেশ কাজে এসেছে তা মনে হচ্ছে। এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাই ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ৯০ শতাংশকে ধরাশায়ী করতে পারছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেপণাস্ত্রড্রোনই প্রতিহত করা হচ্ছে দুবাই থেকে অনেক দূরে, ইরান আর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পৃথক করা সরু সমুদ্রসীমার ওপরে। তাহলে দুবাই কী নিশ্চিন্ত? মোটেও না।

আমাদের প্রথম সকালে আমরা আমাদের হোটেলের খুব কাছেই সুপরিচিত পাম জুমেইরাহতে দুটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শুনি, সম্ভবত সফলভাবেই কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে, কিন্তু তাও ভূমির তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থানে, বলেছেন রে। এরকম ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে পড়ন্ত ধ্বংসাবশেষ। এক সপ্তাহান্তে পর্যটকধন্য দুবাই মেরিনাতে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের উল্টো দিকে থাকা আকাশচুম্বী এক ভবনে শেষ মুহূর্তে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহতের পর ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে। এত জোরে শব্দ হয়, যেমনটা আর আমরা শুনিনি। ধ্বংসাবশেষের টুকরো পড়ে এক গাড়িচালক নিহত হন, তার গাড়িতে আগুন ধরে যায়, বলেন আইটিভির এ সাংবাদিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমৃত্যুর গুজবের মুখে নিজের ভিডিও প্রকাশ নেতানিয়াহুর