দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা

স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল পুরো বিশ্ব মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান, কাল ইসলামাবাদে বৈঠক নিজেদের বিজয়ী দাবি করে ইরান বলেছে তাদের ১০ দফা পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে বাধ্য করেছে যুদ্ধবিরতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিজয়’ আখ্যা হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

টানা উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে গত ৪০ দিন ধরে ইরানের ওপর চলা মার্কিনইসরায়েলের আক্রমণ স্থগিত হল, যা গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলকে ঠেলে দিয়েছিল একটি বৃহত্তর যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। একই সাথে সমগ্র বিশ্বও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দুঃসাহসী ইরান আর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হল ট্রাম্পের ‘পুরো সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ হুমকি কার্যকরে বেঁধে দেওয়া সময়সীমার দেড় ঘণ্টা আগে। যুদ্ধবিরতির এই চুক্তির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তান। দেশটির উদ্যোগে আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সূচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্ট বলেছেন, ‘উভয় পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গঠনমূলকভাবে যুক্ত রয়েছে।’ ইরান নিশ্চিত করেছে, এই দুই সপ্তাহের মেয়াদে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে দেবে। ইসরায়েলও ঘোষণা করেছে, তারা তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুর ওপর হামলা বন্ধ রাখবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে এই পথে তেহরানের প্রতিবন্ধকতার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল।

আমেরিকা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতেই ইরান দাবি করেছে এই যুদ্ধে জয় হয়েছে তাদেরই। তেহরান বলেছে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ১০ দফা পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করেছে, যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ মেনে নেওয়া। অপরদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট ইরান যুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিরতির প্রশংসা করে একে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিজয়’ আখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমাদের সামরিক সাফল্য যে চরম সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে, তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলকে কঠিন আলোচনায় জড়িত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যার দরুন এখন কূটনৈতিক সমাধান ও টেকসই শান্তির পথ খুলেছে।’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ করলে ইরানও তার প্রতিরক্ষামূলক অভিযান স্থগিত রাখবে। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত ও নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ইরানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানানো হয় এই সমঝোতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতেই আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ১. যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগ্রাসন না চালানোর মৌলিক প্রতিশ্রুতি। ২. ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর এখন থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। ৩. ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির স্বীকৃতি। ৪. ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব প্রত্যাহার। ৫. আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে থাকা সব প্রস্তাবের অবসান। ৬. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে থাকা সব প্রস্তাবের অবসান। ৭. উপসাগরীয় অঞ্চলের সব ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। ৮. যুদ্ধের সময় ইরানের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ; যা হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর দেওয়া ফি থেকে পরিশোধ হবে। ৯. বিদেশে জব্দ করা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি ফেরত দেওয়া। এবং ১০. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি বাধ্যতামূলক রেজুলেশনের মাধ্যমে এসব বিষয় অনুমোদন।

অপরদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও কৌশলগত চাপের কারণেই ইরান হরমুজ প্রণালি খুলতে রাজি হয়েছে, যা ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’। এ বিষয়ে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যে ১০দফা পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন, তা বর্তমানে আলোচনাধীন পয়েন্টগুলো থেকে ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘সেগুলো খুব ভালো পয়েন্ট এবং সেগুলোর বেশিরভাগই পুরোপুরি আলোচিত হয়েছে। তবে সেগুলো ততটা কঠোর নয়, যতটা ইরান দাবি করছে।’ যদি আলোচনা ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই আবার যুদ্ধে ফিরে যাবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প। আল জাজিরা বলছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা তার প্রশাসন ১০ দফা পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো, যেমননিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছেড়ে দেওয়া বা সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কিছু বলেনি।

এদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি যেকোনো সময় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব সব পক্ষকে চুক্তির শর্ত মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ইরাক, মিশর, সৌদি আরব এটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং সংলাপের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও একই রকম। জাপান, জার্মানি, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসবাই যুদ্ধবিরতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর প্রমাণ করে যে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইরানের সামরিক বাহিনীও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনো লঙ্ঘনের জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর তাদের আস্থা নেই এবং বাহিনী এখনো ‘ট্রিগারে প্রস্তুত’। সর্বোচ্চ নেতা সাময়িকভাবে গুলি বন্ধের নির্দেশ দিলেও যে কোনো লঙ্ঘনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতির পেছনে একাধিক শক্তির ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তান সরাসরি মধ্যস্থতা করলেও চীনের চাপ ইরানকে আলোচনায় আনতে ভূমিকা রেখেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে রাশিয়া প্রকাশ্যে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘ব্যর্থতা’র কথা বলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদে আসন্ন বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যদি পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা যায় এবং মূল বিরোধগুলোর সমাধানে অগ্রগতি হয়, তাহলে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি হিসেবেই থেকে যাবে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধবিরতি স্বস্তি এনে দিলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। আগামী দুই সপ্তাহই নির্ধারণ করবেএই অঞ্চল নতুন সংঘাতের দিকে যাবে, নাকি শান্তির পথে এক ধাপ এগোবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকল
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে টিসিবির তালিকায় নতুন ৩ পণ্য