কর্নেল (অবঃ) অলির দুর্গ হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম– ১৪ চন্দনাইশ–সাতকানিয়া (আংশিক) আসন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের আলোচিত এ আসনে অলি আহমদ ১৯৮১ সাল থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় ছিলেন মন্ত্রীও। কিন্তু ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করে ছাতা প্রতীক নিয়ে একবার জয়লাভ করেন। এরপর প্রায় ২ যুগ পর বিএনপির দুর্গ বলে খ্যাত চট্টগ্রাম–১৪ চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক সংসদীয় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো বিএনপি।
সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন জসিম উদ্দীন আহমদ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কর্নেল অলি আহমদের ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক। এবার তিনি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন। জামায়াতের সাথে যোগ দিয়েও ছেলেকে এমপি বানাতে ব্যর্থ হন কর্নেল অলি। এবার এলডিপি প্রার্থীর পরাজয়ের মূল তিনটি কারণ উঠে আসে ভোটারদের সাথে আলোচনায়। প্রথমত জামায়াতের সাথে এলডিপির জোটের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি ভোটাররা।
দ্বিতীয়ত ৫ আগস্টের পর থেকে এলডিপির কিছু কিছু নেতাকর্মীর বালু মহাল, বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি, টেন্ডারবাজি অলির ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
তৃতীয়ত ২০ বছর পর বিএনপির পুরনো এই ঘাঁটিতে ধানের শীষ প্রতীক পেয়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে সকল স্তরের নেতাকর্মীরা উৎফুল্ল ও চাঙা হয়ে উঠে এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে শত শত এলডিপি নেতাকর্মীরা জসিমের হাত ধরে তাদের পুরনো দল বিএনপিতে ফিরে আসেন। এতে এলডিপির ভিত্তি নরম হয়ে পড়ে। এদিকে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু নিরব ভোটার এবং সংখ্যালঘু ভোটার ধানের শীষে ভোট দেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই। যা এবার ধানের শীষের প্রার্থীর জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ধানের শীষ প্রার্থীর প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী বিএনপি নেতা এম এ হাশেম রাজু বলেন, চন্দনাইশের মাটি ও মানুষকে অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, তুচ্ছ তাচ্ছিলের ফসল আজকের এই পরিণতি। কর্নেল অলি বিএনপির সাথে বেইমানী করেছে, আবার বিএনপির বিরুদ্ধে নানান কথা–বার্তা বলেছেন, ইতিহাস বিকৃতি করার চেষ্টা করেছেন, স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেছেন, আবার প্রথম বিদ্রোহ করার দাবিও করেন। ইতিহাসকে ম্লান করার বিষয়টি সচেতন, বিবেকবান, জ্ঞানী মানুষ তাকে প্রত্যাখান করেছেন। তিনি ৫০টি বছর আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন জামায়াত শিবির রাজাকার, আলবদর, আলশামস্, তারা এদেশের মা–বোনের ইজ্জত লুণ্টনকারী। আবার ৫০ বছর পর এসে তিনি আবার তাদের সাথেই হাত মিলিয়েছেন। জামায়াতের আমিরের কাছ থেকে ছাতা উপহার নিয়েছেন। আবার বলেছেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি, নাম দিয়েছেন তিনি। এসব উদ্ভুট কথাবার্তা, মিথ্যা, বেইমানির ফসল পেয়েছেন তিনি। চন্দনাইশ–সাতকানিয়ার মানুষ এবারের নির্বাচনে তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছেন।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম গত ১৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়েছে। আপনারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় অংশগ্রহণ করেছেন। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন জায়গায় কারচুপি হয়েছে। বিশেষ করে তিনটি জায়গায় হাশিমপুর তরুণ সংঘ স্কুল, হাশিমপুর বড়পাড়া সরকারি প্রাইমারি স্কুল ও দোহাজারী আবদুর রহমান হাই স্কুলে সাড়ে ৪টার পরে অপরিচিত কয়েকশত লোক প্রবেশ করে। তারা জোরপূর্বক হয়তো ওইখানে যারা প্রিসাইডিং ও পোলিং ছিল তাদের সাথে পূর্বপরিকল্পিত ছিল এভাবে কাজ করার জন্য। তারা অনেকগুলো ব্যালট পেপার সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কর্নেল অলি আরও বলেন, এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যারাই ছিল ৩টার পর থেকে আমাদের যারা নেতা–কর্মীরা কেন্দ্রের বাহিরে ডিউটিরত ছিল তাদেরকে পিটিয়ে বের করে দিয়েছে। প্রশাসনকে বারবার বলা সত্ত্বেও আমাদের যারা কাজ করছিল তাদের উপরে মারপিট করেছে।
অন্যদিকে জসিম ৬–৭টা মাইক্রোবাস নিয়ে, মোটরসাইকেল নিয়ে ডেমো স্টেশন দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করছে এবং সন্ধ্যার আগে ও সন্ধ্যার পরে প্রায় ৩০–৪০টা মাইক্রোবাস নিয়ে ট্রাক নিয়ে মিছিল করে উপজেলা হেডকোয়ার্টারে এসেছে। এখানে আর্মি ক্যাম্প ছিল, পুলিশের ক্যাম্প ছিল, পুলিশের থানা ছিল ও প্রশাসন ছিল তাকে বারণ করে নাই।
তিনি আরও বলেন, আমার কর্মীদেরকে আমি অনেক কষ্ট করে সুশৃংখল রাখার চেষ্টা করেছি। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং যারা এই নির্বাচনের দায়িত্বে ছিল তারা একতরফাভাবে কাজ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের এজেন্টদেরকে সাড়ে ৪টার পরে বের করে দিয়েছে। এ ছাড়াও ওমর ফারুকের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ভোট বাতিল বলে গণ্য করেছে। কর্নেল অলি বলেন, আমি আপনাদেরকে এটাই বলব, সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ওমর ফারুককে পরাজিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আপনাদের অবগতির জন্য এটা জানাতে চাই, আপনারা যদি মনে করেন প্রফেসর ওমর ফারুক পরাজিত হয়েছে, ড. কর্নেল অলি আহমদ পরাজিত হয়েছে, আমরা পরাজিত হয় নাই। আল্লাহর মেহেরবানি, আমার নবীর দয়া মুক্তিযোদ্ধা কখনো পরাজিত হয় না, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কখনো পরাজিত হয় না। পরাজিত হয়েছে টাকা এবং আমার নির্বাচনি এলাকার কিছু লোক।
সদ্য বিজয়ী ধানের শীষের প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমদ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ বিজয় আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণের বিজয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সবাইকে সাথে নিয়ে মিলেমিশে চট্টগ্রাম– ১৪ আসনে সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দেশের সবচেয়ে বড় দল, এই দল সাধারণ কেটে খাওয়া মানুষের দল। অথচ এই দলের প্রতীক ধানের শীষ চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক থেকে প্রায় দুই যুগ বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। দুই যুগ পর তারেক রহমান যখন ধানের শীষ প্রতীক আমাকে তুলে দিলেন, তখন আমি চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক আসনের মা–বোন, মুরুব্বি এবং ভোটারদের কাছে যায়। তাদের বুঝিয়েছি এই নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করবে এবং সরকারে আসবে, আপনারা উন্নয়নের স্বার্থে, কর্মসংস্থানের স্বার্থে, ঐক্যের স্বার্থে, অত্যাধিক মডেল চট্টগ্রাম– ১৪ আসন সাজানোর স্বার্থে ধানের শীষে ভোট দিবেন। সবাইকে ধানের শীষে আস্তা রাখতে বলেছিলাম। ধানের শীষের পক্ষে মানুষের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তারা আমার কথা রেখেছেন, দীর্ঘদিন পর এই আসনটি উদ্ধার করে তারেক রহমানকে উপহার দিয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম– ১৪ আসনের জনগণকে বলেন, তার বাড়িটি সবার জন্য অফিস। যে কোন সময়ে এই অফিসে এসে সমস্যা–সমাধানের কথা বলতে পারবেন। সমপ্রতি ব্যাংক থেকে চাকুরিচ্যুত হয়ে বেকার হয়ে পড়া হাজার হাজার ব্যাংকারদের চাকরি ফিরিয়ে দিতে তিনি এ অঞ্চলের সকল এমপিদের সাথে নিয়ে কাজ করার কথা বলেন।
পরিসংখ্যান মতে, ১৯৭৬ সালে চন্দনাইশ থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ আসনে ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবুল কবির চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রদূত হলে ১৯৮১ সালে উপ–নির্বাচনে তৎকালীন বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ, ১৯৮৮ সালে ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদ। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ, একই বছর ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে কর্নেল অলি জয়লাভ করেন। ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসন ছাড়াও সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসন থেকেও নির্বাচন করেন। নির্বাচনে তিনি দুটি আসনে বিজয়ী হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসনটি ছেড়ে দেন। পরে উপ–নির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী মমতাজ অলি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলহাজ নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় কর্নেল অলি নির্বাচিত হন। একই সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের মেয়াদের শেষ দিকে কর্নেল অলি বিএনপি থেকে বেরিয়ে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলডিপি থেকে ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করে ষষ্ঠবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কর্নেল অলি। শত জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কর্নেল অলি জামায়াত ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ১১ দলীয় জোটে তাঁর ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুককে প্রার্থী করেন। নির্বাচনে তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ এর কাছে ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। জসিম উদ্দিন আহমদ ধানের শীষ প্রতীকে পান ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের শরিক দল এলডিপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ওমর ফারুক ছাতা প্রতীক নিয়ে পান ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট।












