নিম্নচাপের প্রভাবে টানা দুদিনের হালকা, মাঝারি এবং ভারী বর্ষণে একদিকে যেমন নগরের কয়েকটি নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। তবে এবারের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার মাত্রা সহনীয় থাকলেও বৃষ্টির কারণে এইচএসসি পরীক্ষার্থী, খেটে খাওয়া মানুষ, পথচারীসহ নগর জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়লে চট্টগ্রামসহ সমুদ্র বন্দরগুলোকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেয় আবহাওয়া বিভাগ, একই সাথে পাহাড় ধসের সতর্কতাও জারি করা হয়।
আবহাওয়া বিভাগের সতর্কতা জারির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় দিনভর মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাহাড় ঘেঁষা স্কুল–কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে। বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে জেটিতে পণ্য ওঠানামা ও ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত) চট্টগ্রামে মোট ২০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে আমবাগান কেন্দ্রে ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রামে অতি ভারী বৃষ্টি থাকতে পারে আরো ৪–৫ দিন। পাহাড় ধসের শঙ্কাও আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা এবং আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বহাল থাকবে।
ভারী বর্ষণে নগরীর নিচু এলাকাগুলোর রাস্তাঘাট ডুবে যায়। পানি জমে দেখা দেয় জনদুর্ভোগ। কোথাও কোথাও সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। গতকাল এইচএসসি পরীক্ষার ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সয়ে কেন্দ্রে আসা–যাওয়া করতে হয়েছে। তবে অতীতের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক জলাবদ্ধতা এ দফায় হয়নি বলে দাবি করেছে সিটি কর্পোরেশন।
সম্ভাব্য পাহাড় ধস ঠেকাতে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার রাত থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে ৬ জন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে একাধিক টিম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, সচেতনতামূলক প্রচার এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, আকবরশাহ ঝিল ১, ২ ও ৩ নম্বর এলাকা, বিজয়নগর পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলীঘোনা, মতিঝর্ণা, টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের পাহাড়, লালখান বাজার পোড়া কলোনি, ঢেবারপাড়, আমবাগান সংলগ্ন পাহাড় এবং উত্তর হালিশহর উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। পাহাড় সংলগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের মাইকিংয়ের কিছু লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও জীবিকার তাগিদে কিংবা বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে কিছু মানুষ এখনো সেখানে অবস্থান করছেন।
অপরদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। আগে থেকে যেসব জাহাজ পণ্য খালাস করতে গেছে সেগুলোও অলস বসে আছে। সাগর উত্তাল হওয়ায় লাইটারেজ জাহাজের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কন্টেনার হ্যান্ডলিং এবং আমদানি–রপ্তানি পণ্য ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে এবং বৃষ্টিপাত আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৭, ২০০৮, ২০১২, ২০১৭ এবং ২০২২ সালের ভয়াবহ পাহাড় ধসের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার আগাম সতর্কতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।












