দারিদ্র্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ বাড়াতে হবে

| বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

টানা তিন বছর মন্থর প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক প্রতিকূলতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গত ৮ এপ্রিল আগারগাঁওয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৫২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, প্রবৃদ্ধি টেকসই করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে সাহসী ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছেক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য: জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। এর ফলে ২০২৫ সালে আরও ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি: চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে অবস্থান করছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। মূলধন পর্যাপ্ততা বা ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও নিয়ন্ত্রক সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক লোকসান সামাল দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম থাকায় এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে এই ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য সীমিত।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, কয়েক বছর ধরে একটা ধারাবাহিক সংকটজনক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের আয়ব্যয়, দারিদ্র্য পরিস্থিতি ও অন্যান্য খাতে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংগত কারণে ক্ষুদ্র অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। তবে অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি (পিপলস লেন্স) থাকা খুবই জরুরি হয়ে গেছে। শুধু জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ওপর আলোচনাটা সীমাবদ্ধ না রেখে সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিকের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে। দরিদ্রের বাইরে এখন দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়েছে। খাবার, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও শিক্ষাএমন প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে পারছেন না। বর্তমান বাস্তবতায় নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

গবেষণায় এসেছে, সমাজের একটি অংশ অনেক বেশি আয় করছে, অন্যদিকে বড় অংশ খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে পরিবারগুলোর ওপর ঋণের চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে চাপ বেশি। এই ঋণ মূলত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যয়, চিকিৎসা কিংবা ঘর মেরামতের মতো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঋণ করছেন দৈনন্দিন খাবারের খরচ মেটানোর জন্য। ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরেকটি বড় ঝুঁকি। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র অনেক পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে একাধিক বেলা কিংবা মাসে অন্তত এক দিন একেবারেই না খেয়ে থাকছেন। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এখনো ব্যাপক আকারে হয়নি, তবে তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটি উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি বহিরাগত সংকট হলেও এর প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতা নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর। তাই এখনই সময় দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারে মনোযোগ দেওয়ার। তা না হলে দারিদ্র্যের যে অন্ধকার ছায়া আবার ঘনিয়ে আসছে, তা আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হতে পারে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। তদুপরি সামাজিক সুরক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাও সব সময় উপযুক্ত ব্যক্তি পান না। স্বার্থান্বেষী মহল হাতিয়ে নেয়। এ অবস্থায় সরকার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, যাতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে