দক্ষিণ জেলা বিএনপির কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত সংগঠনটির সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ খান। একইভাবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েলকেও দেখা যায় না দলীয় কর্মসূচিতে। অথচ গতকাল এই দুজন পাশাপাশি বসে সভা করেছেন। নগরের চান্দগাঁওয়ে শাহজাহান জুয়েলের বাসায় বিকাল ৪টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ জেলার বিদ্যমান কমিটির অনেক সিনিয়র নেতাকর্মী। তবে অনুপস্থিত ছিলেন আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম। বৈঠকের খবর জানাজানি হওয়ার পর দলটির তৃণমূলে চলছে নানা গুঞ্জন। কেউ কেউ বলছেন, এ বৈঠকের মধ্যদিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরো প্রকট হয়েছে। অনেকে এটাকে অনৈক্যের সুর বলে মন্তব্য করেন।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর আবু সুফিয়ানকে আহ্বায়ক, মোস্তাক আহমেদ খানকে সদস্য সচিব ও আলী আব্বাসকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। ২০২১ সালে ১০ জানুয়ারি আলী আব্বাসকে বহিষ্কার করা হয়। চলতি বছরের ৭ মে এনানুল হক এনামকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এদিকে শুরুতে সুফিয়ান–মোস্তাক ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত থাকলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। সর্বশেষ ১৮ জুলাই দোহাজারী পৌরসভার ইউনিট কমিটি বাতিল করা হয়। ওই আদেশে সুফিয়ানের সঙ্গে মোস্তাকের পরিবর্তে স্বাক্ষর করেন এনাম, যা সাংগঠনিক বিরোধ আরো স্পষ্ট করে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পটিয়ার সাবেক এমপি গাজী শাহজাহান জুয়েলের সঙ্গে দূরত্ব আছে একই এলাকার বাসিন্দা এনামুল হক এনামের সঙ্গে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জুয়েলের পরিবর্তে এনামকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পর সেটা আরো স্পষ্ট হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক নেতা আজাদীকে বলেন, শাহজাহান জুয়েল–এনামুল হক এবং আবু সুফিয়ান–মোস্তাক আহমেদের মধ্যকার বিরোধ রয়েছে। তাই জুয়েল–মোস্তাক এক হয়ে নিজেদের আলাদা বলয় করতে চাচ্ছেন। একদিকে এটা ভালো। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। আবার এটা ভালোও না। কারণ কেন্দ্র থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বললেও তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
তবে দক্ষিণের কোনো নেতার সঙ্গে কোনো বিরোধ ও দূরত্ব নেই বলে দাবি করেছেন গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল। বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে এ দাবি করে তিনি আজাদীকে বলেন, জেলা কমিটির বৈঠক বা দলীয় কোনো সভা ছিল না। বাসায় দেখা করতে এসেছেন, কথাবার্তা বলেছেন। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এসেছেন, সেজন্য হয়তো অ্যাট্রাকটিভ মনে হয়েছে। অনেকজনের ক্ষোভ আছে, তারা সেটা বলেছেন। আমি বলেছি, ক্ষোভ প্রশমন করে আমাদের যে মূল লক্ষ্য সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু সেটা যেন মুখ্য না হয়। চলমান আন্দোলন–সংগ্রামে যেন প্রভাবিত না করে, আমি সেটাই চেয়েছি।
এ বিষয়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান আজাদীকে বলেন, তাদের বৈঠকের বিষয়টি আমার নলেজে নেই। কী জন্য বসেছেন, আসল উদ্দেশ্য কী সেটাও জানি না।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক আজাদীকে বলেন, মোস্তাক আহমেদ খান ওএসডি, তার কোনো পাওয়ার নেই। তাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনিসহ আরো যারা বৈঠকে ছিলেন তার মধ্যে দল থেকে বহিষ্কৃতরাও ছিলেন। কাজেই এটা নিয়ে চিন্তিত না। বহিষ্কৃতদের নিয়ে সাংগঠনিক মিটিং হতে পারে না। তবে এটা আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা সেটা কেন্দ্রে জানাব। তিনি বলেন, শাহজাহান জুয়েলও দলের কর্মকাণ্ডে নেই। সামনে বিএনপির সুদিন আসবে, তাই সুঘ্রাণ নিতে এসেছেন।
এদিকে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে দক্ষিণ জেলায় সাংগঠনিক সংকট রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অনেকে। তারা শাহজাহান জুয়েলকে তৃণমূল কর্মীদের সক্রিয় করার আহ্বান জানান। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য অ্যাডভোকেট ইফতেখার হোসেন চৌধুরী মহসিন, বদরুল খায়ের চৌধুরী, জামাল হোসেন, লায়ন হেলাল উদ্দিন, মোজাম্মেল হক, দক্ষিণ জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শফিকুল ইসলাম চেয়ারম্যান ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আলমগীর তালুকদার টিপুসহ নেতৃবৃন্দ।
বৈঠক প্রসঙ্গে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ খান আজাদীকে বলেন, জাফর ভাই (দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী) মারা যাওয়ার পর দক্ষিণ জেলা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে অভিভাবক না থাকলে এলোমেলো হয়ে যায়। তাই জুয়েল ভাইকে আহ্বান জানিয়েছিলাম তিনি এসে যেন অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন। এটা অরাজনৈতিক প্রোগ্রাম। যেহেতু সবাই রাজনীতির মানুষ তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতি নিয়ে কথা হয়েছে।
দক্ষিণ জেলায় সাংগঠনিক কমিটি আছে। এরপরও কীভাবে অভিভাবকহীন থাকে দল? তাছাড়া চা চক্রে আহ্বায়কসহ অনেক সিনিয়র নেতা অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দলীয় কোন্দল স্পষ্ট হচ্ছে না?-এমন প্রশ্নে মোস্তাক আহমেদ খান বলেন, তিনি (শাহজাহান জুয়েল) নির্বাহী কমিটির মেম্বার। তিনবারের এমপি। রাজনৈতিকভাবেও সিনিয়র। তাই উনাকে বলতেই পারি। উনারও তো দায়িত্ব আছে, সে ভূমিকা পালন করতে বলেছি। আমরা তো আহ্বায়ক হতে বলিনি। আর হ্যাঁ, এখানে কোনো গ্রুপিংয়ের বিষয় নেই। উদ্দেশ্য একটাই, আন্দোলন সফল করা। দক্ষিণ জেলা হচ্ছে বিএনপির ঘাঁটি। এরপরও বিশাল একটি অংশ কর্মসূচিতে আসে না। তাদের কীভাবে সক্রিয় করা যায় সেটাই উদ্দেশ্য। বৈঠকে কারো বিরুদ্ধে কেউ কথা বলেনি।
আপনাকেও তো দীর্ঘদিন দক্ষিণ জেলার কর্মসূচিতে দেখা যায় না। সেটার কারণ কী? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি অসুস্থ ছিলাম। কেন্দ্রকে অবহিত করে চিকিৎসার জন্য বাইরে গেছি। ফিরে কর্মসূচি পালন করেছি। মঞ্চে যাই না।
বৈঠকে উপস্থিত দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জামাল হোসেন আজাদীকে বলেন, মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু কোনো গ্রুপিং হবে না। গ্রুপিং হলে তো দলে শৃঙ্খলা থাকবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুয়েল ভাই তো সিনিয়র। তিনি দীর্ঘদিন পর ডেকেছেন, আমরা গেছি। আমরা বলেছি, রাজনীতি করলে রাজনীতির মতো করতে হবে, মাঠে থাকতে হবে। আন্দোলন সংগ্রামে থাকতে হবে। দল কাকে নমিনেশন দেয় সেটা পরের বিষয়।












