যখন কলামটি লিখতে বসেছি তখন ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধ ২৪ দিন ধরে চলমান রয়েছে। সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবরে যুদ্ধবিরতির আভাস পাওয়া গেলেও ২৬ মার্চ তারিখে কলামটি প্রকাশিত হওয়ার আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করলেও এখনো অর্থনীতি বড়সড় বিপর্যয়ে পড়েনি। ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি ২৩ মার্চ তারিখে শেষ হলেও ২৮ মার্চের আগে সত্যিকারভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক ধারা ফিরে আসবে না। কিন্তু, এরপর অফিস–কল–কারখানা–ব্যবসা–বাণিজ্য খুলে গেলে পরবর্তী সপ্তাহ থেকে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব অর্থনীতিকে ক্রমশ বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। বিষয়টা মাথায় রেখে বক্ষ্যমাণ কলামটি লিখছি। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিকৃত এলএনজি এবং ডিজেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল বিধায় যুদ্ধের ফলে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড়সড় ধস নামার আশংকা রয়েছে। ঈদের বন্ধে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা পাঁচ/ছয় হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে, ২৪ মার্চে ছুটি শেষ হয়ে গেলে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা এক লাফে সতেরো/আঠারো হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হতে পারে। বিশেষত, এপ্রিল মাসে ক্রমবর্ধমান গরম আবহাওয়া বিদ্যুতের চাহিদাকে ক্রমশ তুঙ্গে নিয়ে যাবে, যার ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশংকা সৃষ্টি হবে। কল–কারখানায় গ্যাস–সরবরাহও বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে অন্যান্য খাতগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। সরকার বর্তমানে বেশি দামে বিকল্প সূত্রসমূহ থেকে এলএনজি ও ডিজেল আমদানির যে প্রয়াস চালাচ্ছে সেটা বেশিদিন কার্যকর করার আর্থিক সক্ষমতা সরকারের থাকবে না। সরকারী বাজেটের ঘাটতি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সরকার ব্যাংকগুলো থেকে বর্ধিত ঋণ নেয়ার মাধ্যমে ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করলে ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর ভয়ানক চাপ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অন্যান্য পণ্যের আমদানিও এর ফলে সীমিত করতে হবে। (ইতোমধ্যে সার আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে)। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ দিকে লুটপাটতন্ত্র ও বিদেশে বেধড়ক্ পুঁজি পাচারের শিকার হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনের যে মারাত্মক ধারা রিজার্ভকে ২০২৩ সালের আগস্টের ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তারিখে ২০ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে ফেলেছিল সেখান থেকে প্রধানত প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির ধারা গত দেড় বছর ধরে অর্থনীতিতে সুবাতাস নিয়ে এসেছিল, সে ধারাটাও থেমে যাওয়ার আশংকাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি অভিবাসনের যে প্রবাহ গত দেড় বছর ধরে ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছিল সেটাও বিঘ্নিত হওয়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অসংখ্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ফলে গত ২৪দিন ধরে ওসব দেশে কর্মরত কয়েক হাজার বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিক ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরত যেতে পারেননি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এসব শ্রমিকরা চাকুরি হারিয়ে ফেলবেন। নতুন অভিবাসীদের চাকুরি না পাওয়ার সাথে পুরানো শ্রমিকদের চাকুরি হারানোর ধারা যুক্ত হলে দেশের বেকারত্ব সংকট অচিরেই মারাত্মক আকার ধারণ করবে। উপরন্তু, দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে যদি ঐসব মধ্যপ্রাচ্যের দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকরা নানাবিধ বাধা–বিঘ্নের কবলে পড়েন তাহলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেমিট্যান্স–নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যয়ের গিরিখাতে পড়তে দেরি হবে না। এহেন অর্থনৈতিক শ্লথাবস্থা বা মন্দাবস্থা দেশের সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাকেও টেনে নিচে নামিয়ে ফেলবে।
স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর যে ‘মেল্টডাউন’ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল সেটা অনেকখানি সামাল দিয়ে ফেলেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য–অপসারিত গভর্নর ড. আহসান মনসুর। পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুন্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তাঁর আত্মীয়–স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদেরকে পুঁজি–লুন্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করেছিল স্বৈরশাসক হাসিনা। চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংক–লুটেরা এস আলমকে স্বৈরশাসক হাসিনা ব্যাংক–পুঁজি লুন্ঠনের এক অবিশ্বাস্য সুযোগ প্রদান করেছিলেন। এস আলম কর্তৃক লুন্ঠিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিচে উল্লিখিত সাতটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আল–আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার–গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে এস আলম এই সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য–উপাত্ত হাজির করে দাবি করেছে যে শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানত জামায়াত–শিবির কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ছিল। ঐ সময় ওটা ছিল দেশের প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৃহত্তম ব্যাংক। দেশে আসা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এরকম একটা শক্তিশালী ব্যাংককে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় স্বৈরশাসক হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও মদদে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাত বছরে এস আলম বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে লুট করে নিয়েছে প্রায় সত্তর হাজার কোটি টাকা, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। পতিত সরকারের ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারী বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান রহমানের মালিকানার প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে খেলাপিঋণ রেখে গেছে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকারও বেশি। উপর্যুক্ত ভয়াবহ লুটপাটের মোকাবেলায় ডঃ মনসুর খুবই দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ফাইনেন্সিয়াল সেক্টরকে গত আঠারো মাসে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তারিখে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল সেখান থেকে রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ড. মনসুরের অপসারণের তারিখ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে, ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ডলারের বাজার দর গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকও সফলভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে। ব্যাংকের মোট আমানত আবার আঠারো লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকের ঋণের হারও ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে চলমান ২০২৫–২০২৬ অর্থ–বছরে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের দক্ষতা নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে। এমতবস্থায়, যুদ্ধের ফলে আর্থিক খাতে ইতোমধ্যে উদ্ভূত এবং অদূর ভবিষ্যতে আসন্ন বিভিন্ন ডাইমেনশনের বিপর্যয় এহেন তুলনামূলকভাবে অদক্ষ গভর্নর কতখানি সামাল দিতে সক্ষম হবেন তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সোয়েটার ফ্যাক্টরির নামে ৮৯ কোটি টাকা খেলাপিঋণ রয়েছে বলে পত্র–পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, যে ঋণ তিনি কিছুদিন আগে পুনর্তফশিলীকরণের মাধ্যমে নাকি নিয়মিত করে নিয়েছেন। গভর্নর যদি ঋণখেলাপিদের প্রতি নমনীয় হন তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা—প্রায় ৩১ শতাংশ খেলাপিঋণ—এর কোন সমাধান অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে না। অতএব, আগামী দিনগুলোতে আবার ব্যাংকিং সেক্টর দেউলিয়াপনার দিকে ধাবিত হবে কিনা কিংবা অস্থিতিশীল অবস্থায় পতিত হবে কিনা সেটা নিয়ে উদ্বেগ থাকাই স্বাভাবিক!
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে স্বৈরশাসক হাসিনার লুটপাটতন্ত্রকে কঠোরভাবে দমন করে অর্থনীতিতে সুবাতাস ফিরিয়ে এনেছিলেন। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে যখন বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিল তখন তাদের কাছে অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা স্বস্তিকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মার্চের গত ২৪দিন ধরে চলমান যুদ্ধ নতুন সরকারের জন্য অভাবনীয় সংকট ডেকে এনেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এদ্দিন পর্যন্ত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মোটামুটি সঠিক ছিল বলা চলে। কিন্তু, ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান মনসুরকে অপমানজনকভাবে অপসারণ করে একজন ব্যবসায়ীকে প্রথমবারের মত গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্তটি বর্তমান সরকারের সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রবলভাবে সমালোচিত হয়ে চলেছে। ঐ অপসারণের পরপরই আসে যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত সংকট। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের মত একটি স্বল্পোন্নত দেশ চরম বিপর্যয়ের গিরিখাতে পতিত হবেই—এর অন্যথা হওয়ার জো নেই। এখন আমাদেরকে মহান আল্লাহতাআলার কাছে প্রার্থনা করতে হবে যাতে অচিরেই যুদ্ধ–বন্ধের সম্ভাবনাটি বাস্তবায়িত হয়।
লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।











