মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে অন্তত ছয় মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ইরান। এ অবস্থায় ইসরায়েলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তেহরানে বিমান অভিযান এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থায় মানবিক সংকট–সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের ‘নতুন প্রেসিডেন্ট’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ ও উন্মুক্ত হলে তবেই এ বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। অন্যথায় ইরানকে কঠোর সামরিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তবে এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুদ্ধবিরতির কোনো প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, গণমাধ্যমে প্রচারিত তথাকথিত ‘পাঁচ দফা প্রস্তাব’ অনুমাননির্ভর। তিনি স্পষ্ট করে জানান, আক্রমণকারী পক্ষকে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নই ওঠে না। একই সঙ্গে আরাঘচি জানান, ইরান অন্তত ছয় মাস যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে আরও দীর্ঘ সময় লড়াই চালাতে সক্ষম। তার ভাষায়, ইরান সময়সীমা দেখে না, বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য।
গতকাল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, সর্বশেষ দফায় তারা শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এবং প্রায় ২০০ রকেট নিক্ষেপ করেছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকা ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক স্থাপনা। ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে ইরানের অন্তত ১১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে ১৪ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশু–কিশোরও রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত করা হলেও কিছু খোলা জায়গায় আঘাত হানে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। অন্যদিকে ইসরায়েলও পাল্টা তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে ‘নির্ভুল বিমান হামলা’ চালানোর কথা জানিয়েছে। এসব হামলা মূলত সরকারি স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও ক্ষয়ক্ষতির নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির ১৩০টির বেশি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘ইরান ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন থেকে দুঃসাহসিক হামলা’ চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল–রাজহি জানান, এ হামলায় বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর ফলে ‘ঘটনাস্থলে একটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে’। তিনি আরও জানান, জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো ঘটনাস্থলে কাজ করছে। তবে হামলায় ‘শুধু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কোনো হতাহত হয়নি’।
সংঘাতের প্রভাব সমুদ্রপথেও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় প্রায় ২,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে। এতে প্রায় ২০ হাজার নাবিক খাদ্য ও পানির সংকটে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে তাদের সাহায্যের আর্তি বাড়ছে।
নেটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প : নেটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ‘গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটো জোটকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প এবং যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ট্রাম্প আরও বলেন, আমি কখনোই নেটোর দ্বারা প্রভাবিত হইনি। আমি বরাবরই জানতাম যে তারা কাগুজে বাঘ, আর পুতিনও বিষয়টি জানেন।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামপ্রতিক হুমকি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, আমি যুদ্ধ নিয়ে আমার অবস্থান পরিবর্তন করব না।
স্টারমার ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ–চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃস্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এক শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার। তিনি বলেন, সম্ভাব্য সব ধরনের কূটনৈতিক পথই অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
বিশ্বের এক–পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের এই রুটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারত ও চীনের মতো এশীয় দেশগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই অবরোধ বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।













