মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত জীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বছর বিদেশি তহবিলেও দেখা দিয়েছে সংকট। চলতি বছরের জন্য যে পরিমাণ তহবিল চাওয়া হয়েছিল, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ১০ মাসে এসেছে তার মাত্র ৫৪ শতাংশ। আগের তিন বছরে প্রত্যাশিত তহবিলের ৭২ শতাংশের বেশি পাওয়া গিয়েছিল। এই তহবিল আহ্বান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপ মনে করছে, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কাই এবছর তহবিল সংগ্রহে এই নাজুক দশার মূল কারণ। খবর বিডিনিউজের।
অভূতপূর্ব বৈশ্বিক মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব। অর্থনীতি সঙ্কুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশকে স্বাস্থ্য সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজসহ বিভিন্ন খাতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে। তহবিলের এই সঙ্কট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে বলে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, এভাবে ফান্ড কমতে থাকলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য ’বোঝা হয়ে যাবে’। ২০১৭ সাল থেকে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) নামে রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজটি করে আসছে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপ। বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পোর সঙ্গে এই গ্রুপের কো-চেয়ার হিসাবে রয়েছেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) আবাসিক প্রতিনিধি স্টিভেন করলিস এবং আইওএম বাংলাদেশের চিফ আব মিশন গিওর্গি গিগাওরি।
চলতি বছর সর্বশেষ জেআরপিতে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৭ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনাভাইরাস মোকাবেলার অংশ হিসাবে তার সঙ্গে আরও ১৮ কোটি ১৪ লাখ ডলার যোগ করা হয়। জাতিসংঘের অফিস ফর দি কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) তথ্য বলছে, দুই ভাগে জেআরপিতে মোট ১০০ কোটি ডলারের মধ্যে অক্টোবরের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ফান্ড এসেছে ৫৭ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। চলতি বছরের দুই মাস বাকি থাকতে পরিকল্পনার মাত্র ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ মিটেছে। এমন অবস্থায় আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সহায়তা যেন অব্যাহত থাকে সে আহ্বান এসেছে জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থা থেকে। ফান্ড কমে আসার মধ্যে অক্টোবরের ২২ তারিখে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের সহায়তায় দাতাদের ভার্চুয়াল সম্মেলন আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। ওই সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় প্রায় ৬০ কোটি ডলার সহায়তার অঙ্গীকার করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও দেশ।তহবিল কমার প্রসঙ্গ টেনে ওই সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিশনার ইয়ানেস লেনারচিচ বলেন, এই সঙ্কট যেন বিস্মৃত ট্রাজেডিতে পরিণত না হয়, আমাদেরকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
তহবিলের হাল: জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর ও আইওএম যৌথভাবে কক্সবাজারের ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে তহবিল চেয়ে আসছে। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) নামে ওই সহযোগিতা কার্যক্রমে ২০১৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা নিয়ে আসছে ওই তিন সংস্থা। ওই বছরের অগাস্টে রোহিঙ্গা ঢল নামার পরপর প্রথম জেআরপি করা হয়, যাতে চার মাসের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার। তার মধ্যে ৭৩ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ কোটি ৭২ লাখ ডলার এসেছিল দাতাদের কাছ থেকে। ওই সময়ে জেআরপির বাইরে দাতাদের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বাংলাদেশে আরও ২২ কোটি ডলারের ফান্ড এসেছিল। সব মিলিয়ে তহবিলের আকার ৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালের জন্য করা জেআরপিতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫ কোটি ৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে এসেছিল ৬৮ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা মোট পরিকল্পনার ৭২ শতাংশ। সঙ্কটের দ্বিতীয় বছর জেআরপির বাইরে ১৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের সহায়তা এসেছিল বাংলাদেশে। সব মিলিয়ে ওই বছর রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে ৮২ কোটি ১৭ লাখ ডলারের তহবিল আসে।
আগের দুই জেআরপির ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালেও পরিকল্পনার ৭৫ শতাংশ ফান্ড এসেছিল দাতাদের কাছ থেকে। প্রাক্কলিত ৯২ কোটি ৫ লাখ ডলারের মধ্যে ৬৯ কোটি ১ লাখ ডলার পাওয়া গিয়েছিল। জেআরপির বাইরে ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বাংলাদেশে ১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার আসে। সব মিলিয়ে গত বছর রোহিঙ্গাদের জন্য পাওয়া তহবিলের আকার দাঁড়ায় ৮৩ কোটি ৮৪ লাখ ডলারে।
প্রথম তিনটি জেআরপির ৭২ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত তহবিল হাতে পাওয়া গেলেও এবার ১০ মাসে এসেছে ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আর জেআরপির বাইরে চলতি বছর এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে এসেছে ১৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার। তিন বছরের মাথায় রোহিঙ্গা সঙ্কট থেকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের মনোযোগ ক্রমান্বয়ে সরে যাচ্ছে কি-না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তা তো যাচ্ছেই। প্রাথমিকভাবে যে অগ্রাধিকার তাদের দিক থেকে ছিল, তা এখন আর নেই। তহবিলের বিষয়ে এক প্রশ্নে মোমেন বলেন, বাংলাদেশের নামে তারা যে ফান্ড আনে, কত টাকা আনে, কোথা থেকে আনে, কীভাবে খরচ করে- তার কোনো কিছুই আমাদেরকে জানায় না।
তারা রোহিঙ্গাদের পেছনে কত টাকা খরচ করে আর কত টাকা নিজেদের পেছনে খরচ করে তাও আমরা জানি না। অথচ টাকা আনছে বাংলাদেশের নামে।












