মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে গতকাল থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সেক্টরে রেশনিং শুরু হয়েছে। গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দেশি বিদেশী দুইটি কারখানার সার উৎপাদন। এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশেষ এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল দেয়া হচ্ছে না। পেট্রোল এবং অকটেন চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। তবে ঠিক কতদিন পেট্রোল ও অকটেনের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা যাবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।
সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্বের জ্বালানি খাত। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও এলএনজি পরিবহনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশের বেশি এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই বিশ্বব্যাপী পরিবাহিত হয়।
সামপ্রতিক সংঘাতের কারণে এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং শত শত তেল ও এলএনজি ট্যাংকার উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়েছে। গতকাল প্রাপ্ত এক তথ্য অনুযায়ী প্রায় এক হাজার জাহাজ হরমুজ প্রণালীর দুইদিকেই আটকা পড়ে আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেল ও গ্যাস বোঝাই করে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা কয়েকশ’। হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্বের নানা দেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ যেমন উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দরে নোঙর করতে পারছে না, ঠিক তেমনি ওইসব দেশ থেকে তেল ও গ্যাস নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে নোঙর তুলতে যাওয়া জাহাজগুলোও আটকা পড়ে আছে। এতে করে তেল ও গ্যাস প্রবাহ থমকে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ চেইনে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশ বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সেক্টরে যুদ্ধের অভিঘাত লাগতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের গ্যাস সেক্টরে স্বস্তির পুরোটাই আমদানি নির্ভর। চট্টগ্রামের পুরো গ্যাস সেক্টরই আমদানি নির্ভর। দেশে উত্তোলিত গ্যাস চট্টগ্রামে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। আমদানিকৃত এলএনজি ঠিকঠাকভাবে পৌঁছালে চট্টগ্রাম গ্যাস পাবে, গ্যাসের জাহাজ না আসলে গ্যাস নেই চট্টগ্রামে। ইতোমধ্যে গ্যাস নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আগামী ১১ মার্চ তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি নিয়ে একটি জাহাজ মহেশখালী পৌঁছাবে। এর পরপরই আরো ৫টি জাহাজ আসার সিডিউল থাকলেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায় এলএনজিবাহী উক্ত ৫টি জাহাজ (কার্গো) কবে নাগাদ পৌঁছাবে তা বলা যাচ্ছে না। ওই জাহাজগুলোতে ১৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস রয়েছে। গ্যাস সরবরাহের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার সার উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে গ্যাস সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। শুরুতে চট্টগ্রামের দেশীয় সার কারখানা সিইউএফএল এবং বহুজাতিক সার কারখানা কাফকোর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারখানা দুইটিতে গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, কাঁচামালও। গ্যাস থেকেই ইউরিয়া সার উৎপাদন করা হয়। কারখানা দুইটি দৈনিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস ব্যবহার করে। গতকাল একইসাথে এই দুইটি কারখানা বন্ধ করে দেয়ায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হতে শুরু করেছে। চট্টগ্রামে গতকাল সরবরাহ দেয়া হয়েছে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। যা থেকে চট্টগ্রামের শিল্প, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক খাতে যোগান দেয়া হচ্ছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুইটি সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা হচ্ছে। অন্যান্য খাতে এখনো ডিস্ট্রার্ব করা হচ্ছে না। তবে ১১ মার্চের পরে যদি গ্যাস বোঝাই জাহাজ না পৌঁছায় সেক্ষেত্রে গ্যাসনির্ভর সবগুলো খাতই মুখ থুবড়ে পড়বে। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনায় কাফকো ও সিইউএফএল বন্ধ করা হয়েছে। আপাতত গ্যাস ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গৃহস্থালি ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী এমটি নর্ডিক পলাঙ জাহাজ সৌদি আরবে আটকা পড়ে রয়েছে। অপর একটি জাহাজ আগামী ২২ মার্চ আবুধাবী থেকে যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব জাহাজের বাংলাদেশে পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ বড় ধরনের সংকটে পড়বে। এই সংকট মাথায় রেখেই বিপিসি গতকাল থেকে ডিজেল সরবরাহে রেশনিং শুরু করেছে। বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধানী তিনটি তেল বিপণন কোম্পানিই গতকাল ডিলারদেরকে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল দেয়নি। কেউ দুই ভাউজারের চাহিদা দিলে সরবরাহ দেয়া হয়েছে এক ভাউজার। ৫ ভাউজার চাইলে দেয়া হয়েছে ২ ভাউজার। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণ ঘটবে না বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন।
সূত্র বলেছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং নগরজীবনে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের শুরুতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেন।
অপরদিকে দেশে সারের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে চট্টগ্রামের সিইউএফএল ও কাফকো। ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে দুইটি কারখানা দৈনিক প্রায় ৩ হাজার টন সার উৎপাদন করতে পারে। কারখানা দুইটি বন্ধ করে দেয়ায় দেশে সার উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। যা দেশের কৃষি সেক্টর এবং আসন্ন মৌসুমে সার সংকটকে উস্কে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সরবরাহে আরও ব্যাপকভাবে রেশনিং ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশংকাও প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস ও জরুরি পরিকল্পনার দিকে দ্রুত এগোতে হবে, নইলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে।












