জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেখানে তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের মামলা প্রত্যাহারের বিধান রাখা হয়েছে।
গতকাল সোমবার জারি করা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ)’ অধ্যাদেশে অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। খবর বিডিনিউজের।
২০২৪ সালের জুলাই–অগাস্টে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে ব্যাপক সহিংসতায় প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণহানির তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘ। ওই অভ্যুত্থানের মধ্যে এবং সরকার পতনের পরে বিক্ষোভকারীদের রোষের মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা; ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের ওই আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সরকার। অভ্যুত্থানকারীদের ওপর চলা সহিংসতার জন্য তৎকালীন সরকারের কর্তাব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচার করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর বিপরীতে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল জুলাই আন্দোলনকারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে সুরক্ষা অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা উপ–ধারা (২) এর বিধান অনুসরণপূর্বক প্রত্যাহার করা হইবে এবং, ধারা ৫ এর বিধান সাপেক্ষে, এতসম্পর্কিত নূতন কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের আইনত বারিত হইবে।
মামলা প্রত্যাহারের পদ্ধতি তুলে ধরে উপ–ধারা ২–এ বলা হয়েছে, যেক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক এই মর্মে প্রত্যয়ন করা হয় যে, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করিবার কারণে দায়ের করা হইয়াছে, তাহা হইলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকারনিযুক্ত কোনো আইনজীবী উক্ত প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন দাখিল করিবেন; উক্ত আবেদন দাখিলের পর আদালত উক্ত মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করিবে না, উহা প্রত্যাহারকৃত বলিয়া গণ্য হইবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা, ক্ষেত্রমত, খালাসপ্রাপ্ত হইবেন।
অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তের ভার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দিয়ে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকিলে তাহা কমিশনে দাখিল করা যাইবে এবং কমিশন উক্ত অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫ সনের ৬২ নং অধ্যাদেশ) এ যাহা কিছু থাকুক না কেন, যেক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সেইক্ষেত্রে কমিশন উক্ত প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে বর্তমানে বা পূর্বে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করিবে না; তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে গ্রহণ করিবার প্রয়োজন হইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করিয়া কমিশনের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করিবেন।
‘প্রতিষ্ঠান’ বা ‘বাহিনী’ বলতে বাংলাদেশের কোনো আইন দ্বারা বা আইনের অধীন প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীকে বোঝানোর কথা বলা হয়েছে অধ্যাদেশে। কমিশনে জমা পড়া অভিযোগ নিষ্পত্তির পদ্ধতি তুলে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, যেক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, সেইক্ষেত্রে কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করিবে; অতঃপর আদালত উক্ত প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন সমতুল্য গণ্যপূর্বক পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করিবে।
তবে, এই হত্যাকাণ্ড ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের’ অংশ হিসেবে বিবেচিত বিচারের দিকে না গিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে। ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের’ সংজ্ঞায় অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সংঘটিত কার্যাবলি। আর অধ্যাদেশ অনুযায়ী ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’–এর অর্থ হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিরোধের পরিবর্তে সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, যেক্ষেত্রে কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, সেইক্ষেত্রে কমিশন উপযুক্ত মনে করিলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকারকে আদেশ প্রদান করিতে পারিবে; এবং উক্ত ক্ষেত্রে কোনো আদালতে সংশ্লিষ্ট কার্য সম্পর্কিত কোনো মামলা দায়ের করা যাইবে না কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।
জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইনে বলা হয়, যেহেতু বাংলাদেশের ছাত্র–জনতা ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে, যাহা পরবর্তীকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হিসাবে স্বীকৃতি পায়; যেহেতু উক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে আত্মরক্ষাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অনিবার্য হইয়া উঠে; যেহেতু উপরি–উক্ত প্রতিরোধকর্মে এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করিবার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী গণঅভ্যুত্থানকারীদের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৬ অনুযায়ী সুরক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, এ অধ্যাদেশ ‘অবিলম্বে’ কার্যকর হবে এবং ২০২৪ সালের ১ জুলাই হতে বলবৎ হয়েছে বলে গণ্য হবে।












