প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, আল্লাহর প্রেরিত নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম’র আনুগত্য করুন, কথায় কাজে আক্বিদায় বিশ্বাসে চিন্তা চেতনায় অনুভবে নবী রাসূলগণের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করবে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, যেখানে সে চিরদিন অবস্থান করবে। (সূরা: জ্বীন, আয়াত: ২৩)
হযরত হারুন (আ.)’র পরিচিতি :
নাম: তাঁর নাম মুবারক হারুন। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী ও রাসূল হযরত মুসা (আ.)’র বড় ভাই। তিনি আল্লাহর মনোনীত নবী ছিলেন। পবিত্র কুরআনে ১৩৫ জায়গায় তার নাম উল্লেখ রয়েছে। তাঁর আয়ুষ্কাল ১৩০ বছর। তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.) এর বংশধর। তার বংশ তালিকা হলো নিম্নরূপ: পিতার নাম: ইমরান ইবন ইয়াসহার ইবন কাহাছ ইবন গাযির (য়াসহার) ইবন লাবী ইবন ইয়াকুব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম (আ)।
আল কুরআনের আলোকে হযরত হারুন (আ.)’র মর্যাদা :
হযরত হারুন (আ.) ছিলেন আল্লাহর মনোনীত নবীদের অন্যতম। হযরত মূসা (আ.) এর দুুআর বরকতে আল্লাহ তা’আলা হযরত হারুন (আ.) কে নবুওয়ত দান করেছেন। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, আমি তো আপনার নিকট ওহী প্রেরণ করেছি। যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করেছিলাম। ইবরাহীম ইসমাঈল, ইসহাক ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগন, ঈসা, আইয়ুব, ইউনূস, হারুন ও সোলায়মানের নিকট ওহী প্রেরণ করেছিলাম এবং দাউদকে যবুর দিয়েছিলাম। (সূরা: আননিসা, আয়াত: ১৬৩)
হযরত মুসা (আ.) ও হারুন (আ.) কে মিশরে প্রেরণ ও তাঁর কওমের প্রতি সালাত কায়েমের নির্দেশ :
মহান আল্লাহ পথভ্রষ্ট জাতিকে হিদায়াত ও পরিশুদ্ধ করার দ্বীনি দায়িত্ব দিয়ে তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূলগণকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছিলেন। নবী–রাসূলগণ বিভ্রান্ত জাতি গোষ্ঠীকে সঠিক পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে দ্বীনি কর্মসূচির মাধ্যমে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ ও পরিবেশ থেকে উদ্ধার করে আলোর পথের সন্ধান দেন। সালাত কায়েমের বিধান জারি করে সত্যান্বেষী মানুষের নৈতিক মান উন্নত করেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, “আমি মূসা ও তাঁর ভ্রাতাকে ওহী করলাম মিশরে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য গৃহ স্থাপন কর এবং তোমাদের গৃহগুলোকে ইবাদত গৃহ কর, সালাত কায়েম কর এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও। (সূরা, ইউনূস, আয়াত: ৮৭)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত তাফসীরকার “হাকীমূল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহ.)” প্রণীত “তাফসীরে নূরুল ইরফানে” উল্লেখ হয়েছে বসবাসের ঘরের কোন একটা অংশে ঘরোয়া মসজিদ বানানো নবীগণের সুন্নাত। এ অংশ পবিত্র রাখবে। এ কথাও প্রতীয়মান হলো ঘরগুলোতে কিছু কিছু নামায পড়া চাই। ফরজ নামায সমূহ মসজিদে পড়া হোক। সুন্নাত বা নফল নামায সমূহ ঘরে পড়া যায়। মহিলারা ঘরে নামায পড়া উত্তম। বসবাসের জন্য ঘর বানানোও নবীগণের সুন্নাত এবং ইবাদত। অহংকার করার জন্য নয়, প্রয়োজন পূরণ করার জন্য এবং নির্মিত ঘরে নামাযের জন্য জায়গায় নির্ধারণ করা সুনাত। মুসা (আ.) ও হারুন (আ.) এর দ্বীনে নামায ফরজ ছিলো।
হযরত মূসা (আ.) ও হারুন (আ.) কে আনমানি কিতাব প্রদান :
আসমানী কিতাব হলো সত্য মিথ্যার পাথর্ক্য বিধানকারী উপকারী গ্রন্থ। মানব জাতির জীবন চলার খোদায়ী নির্দেশিকা, মানব জাতির মুক্তির সনদ। সত্যান্বেষী বান্দারা নবী রাসূল গণের উপর অবতীর্ণ কিতাব ও সহীফা অনুসরনে সুপথ প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তা’আলা হযরত মূসা (আ.) কে তাওরাত কিতাব দান করেছিলেন, হযরত হারুন (আ.)’র জন্যও এ কিতাবের বিধান দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, আমি তো মূসা ও হারুনকে দিয়েছিলাম “ফুরকান” জ্যোতি ও উপদেশ মুত্তাকীদের জন্য, যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং তারা কিয়ামত সম্পর্কে ভীত–সন্ত্রস্ত। ইহা কল্যাণময় উপদেশ। আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি। তবুও কি তোমরা এটিকে অস্বীকার কর। (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত: ৪৮–৫০)
মূসা (আ.) কর্তৃক হারুন (আ.) কে দাওয়াতী কাজে সহযোগী করার জন্য আল্লাহর নিকট আবেদন :
আল্লাহ তা’আলা অত্যাচারী শাষক ফিরাউনকে তাওহীদের দাওয়াত দানের জন্য হযরত মূসা (আ.) কে প্রেরণ করেছিলেন। হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর নিকট আবেদন করেছিলেন, তাঁর দ্বীনি দাওয়াতের কাজে তাঁর ভাই হযরত হারুন (আ.) কেও যেন সহযোগী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা নবী রাসূলগনের দুআ ফেরত দেন না, দুআ কবুল করা হলো, হযরত হারুন (আ.) কেও নবুওয়ত দান করা হলো, তাঁরা দু’জন একত্রে ফিরআনকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, সীমালঙ্গনকারী এ জালিম শাহীর কর্ণপাত হলো না। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, ফিরআউনের নিকট যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। (মূসা) আরজ করলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার জন্য আমার বক্ষ খুলে দাও এবং আমার জন্য আমার কর্ম সহজ করে দাও, আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দাও যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। এবং আমার জন্য আমার পরিবার বর্গের মধ্য থেকে একজন সাহায্যকারী করে দাও! সে কে? আমার ভাই হারুন! তাঁর দ্বারা আমার কোমর শক্ত কর এবং তাকে আমার কর্মে অংশীদার করো। যাতে আমরা তোমার অধিক পবিত্রতা ঘোষণা করতে পারি। এবং অধিক ভাবে তোমাকে স্মরণ করতে পারি। তুমি তো আমাদের সম্যক দ্রষ্টা। তিনি বললেন, হে মূসা! তুমি যা চেয়েছে তা তোমাকে দেওয়া হলো এবং আমি তো তোমার প্রতি আরো একবার অনুগ্রহ করেছিলাম। (সূরা: ত্বাহা, আয়াত: ২৪–৩৬)
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে “নূরুল ইরফানে” উল্লেখ করা হয়েছে যে আল্লাহর কুদরতে, মূসা (আ.) ফিরআউনের ঘরে লালিত–পালিত হয়েছিলেন, তিনি ফেরআউনের দাড়ি ধরে তার মুখমন্ডলে চপেটাঘাত করেছিলেন, এতে ফেরআউন ক্রোধান্বিত হলো, তাঁকে হত্যা করতে মনস্থ করলো, ফেরআউনের স্ত্রী আছিয়া বললেন এ তো অবুঝ শিশু। তাঁর তো এখনো আগুন ও স্বর্ণের মধ্যে পার্থক্য করার বয়স হয়নি। এ কথার পর ফেরআউন পরীক্ষা করার জন্য এক পাত্রে আগুন আরেক পাত্রে লাল রঙের ইয়াকুত পাথর সামনে রেখে ছিলো, তিনি জলন্ত আগুনের কয়লা মুখে প্রবেশ করে নিলেন। যার কারণে মূসা (আ.)’র যবান মুবারকে তোতলামী সৃষ্টি হয়েছিলো। তাফসীরে আরো উল্লেখ রয়েছে মূসা (আ.) এর তোতলামী সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়নি। তবে বেশির বাগ দূরীভূত হয়ে গেছে, এর ফলে তিনি দ্বীনি দাওয়াত তথা তাবলীগে দ্বীনের কাজ আঞ্জাম দানে সক্ষম ও সফল হয়েছেন। তাফসীরে আরো উল্লেখ হয়েছে, নবী গণের দুআয় নবুওয়াত লাভ করা যায়। (তাফসীরে নূরুল ইরফান)
ইন্তিকাল :
আল্লাহ মূসা (আ.) কে ওহী করলেন, তুমি হারুন কে নিয়ে অমুক পাহাড়ে যাও, তাঁরা আদিষ্ট হয়ে পাহাড়ে গেলেন, সেখানে একটি গৃহ দেখলেন। হারুন (আ.) গৃহের ভেতরে দেখে আশ্চার্যান্বিত হলেন, তিনি মূসা কে বললেন, আমি গৃহের ভেতরের খাটে বিছানায় ঘুমাতে চাই। মূসা (আ.) বললেন আপনি খাটের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ুন। সেখানে তাঁর ইন্তিকাল হয়। ইন্তিকালের পর গৃহ এবং গৃহের খাটটি অদৃশ্য হয়ে গেল। (ক্বাসাসুল আম্বিয়া, আল্লামা ইবন কাছীর)
হে আল্লাহ আমাদেরকে নবী রাসূল আলাইহিমুস সালাম’র জীবনাদর্শ অনুস্মরণ করার তাওফিক দান করুন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি); খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












