জুম’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২৩ জুন, ২০২৩ at ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ

ইসলামে কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম’র স্বপ্ন:

৮ ই জিলহজ্ব রাত্রে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখলেন যে, একজন ফিরিস্তা তাঁকে এ মর্মে আল্লাহ তা’আলার আদেশ শুনালেন যে, হে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম! কুরবানী করো, তিনি নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে সকাল হওয়া মাত্রই আল্লাহর নামে একশত উট কুরবানী দিলেন, ৯ই জিলহজ্ব রাতে ২য় বার একই স্বপ্ন দেখলেন তিনি পূনরায় একশত উট আল্লাহর নামে কুরবানী দিলেন। তৃতীয় দিন আবারো একই স্বপ্ন দেখার পর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আরজ করলেন হে আল্লাহ! কোন বস্তু তোমার রাস্তায় কুরবানী করবো? আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, তোমার নিকট দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ও ভালোবাসার বস্তুটি তুমি আমার রাস্তায় কুরবানী করো। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন আল্লাহ তা’আলা আমার প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানীর নির্দেশ করেছেন। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে আল্লাহর নির্দেশ শ্রবণ করে ভীত হননি, চিন্তিত ও বিচলিত হননি বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (🙂কে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হলেন। (আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড: ৩য়, পৃ: ৩৬৭ কৃত: আল্লামা আনোয়ার আহমদ কাদেরি)

কুরবানীর প্রস্তুতি পর্ব:

হযরত ইসমাঈল (:)’র বয়স যখন সাত বৎসর বা তের বৎসর, হযরত ইবরাহীম (.) তাঁর পূণ্যবতী স্ত্রী হযরত হাজেরা (রা.) কে বললেন, ওহে প্রিয়তমা স্ত্রী, আজকে এক মহান বাদশার দরবারে আমাদের প্রিয় বৎস ইসমাঈলের দাওয়াত রয়েছে, এ কথায় হযরত হাজেরা ভীষণ খুশী হলেন, আদরের পুত্র হযরত ইসমাঈল (🙂কে গোসল করিয়ে দিলেন, উত্তম পোশাক পরিয়ে দিলেন, চোখে সুরমা লাগিয়ে দিলেন, মাথার চুলে চিরুনী করে দিলেন উত্তমরূপে সাজিয়ে কলিজার টুকরো সন্তানকে পিতার সাথে দাওয়াতে বের করে দিলেন। আরেক বর্ণনায় পাওয়া যায় হযরত ইবরাহীম (.) জিলহজ্বের দশ তারিখ মক্কা মুকাররমা থেকে মিনার উদ্দ্যেশে রওয়ানা হলেন একদিকে আল্লাহর নবী আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় এক কঠিন অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন অপরদিকে বিতাড়িত অভিশপ্ত ইবলিস শয়তান বড়ই চিন্তিত ও পেরেশান, অভিশাপ্ত শয়তান কুরবানী প্রতিরোধ ও বাধাগ্রস্ত করতে অপচেষ্টায় লিপ্ত। হযরত ইবরাহীম (🙂 আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করা ও হযরত ইসমাঈল (.) আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী হওয়া, ত্যাগ ও কুরবানীর এ মহা পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করতে শয়তান নানা চক্রান্তে সক্রীয়ভাবে তৎপর হয়েছে। যেহেতু আল্লাহর রাস্তায় প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করার মধ্যে রয়েছে মহান মর্যাদা ও পুরস্কার। এ গৌরবময় মর্যাদা থেকে আল্লাহর নবী যেন বঞ্চিত হয়ে যায় শয়তান নানামূখী প্রতারণা শুরু করলো। প্রথমে শয়তান এক বৃদ্ধ লোকের আকৃতি ধারণ করে হযরত হাজেরা (রা.)’র নিকট গিয়ে বললো হে হাজেরা! আজ ইবরাহীম (.) তোমার পুত্র ইসমাঈল কে নিয়ে কোন দাওয়াতে যাননি, প্রকৃত ঘটনা হলো, তাঁর পিতা তাঁকে যবেহ করার জন্য নিয়ে গেছে, তদুত্তরে হযরত হাজেরা বললেন, কোন দয়াবান পিতা কি নিজ আদরের সন্তানকে যবেহ করতে পারে? শয়তান বললো এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম (🙂 কে হুকুম করেছেন, শয়তানের কথা শুনে হযরত হাজেরা বললেন, তুমি তো মনে হয় ইবলিস শয়তান। যদি সত্যিই আল্লাহ তা’আলা হুকুম দিয়ে থাকেন তাহলে তো এক ইসমাঈল কেন? হাজারো ইসমাঈল যদি হয় একে এক প্রত্যেক কে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী দিয়ে দিব। এটা তো আমার আদরের পুত্র ও আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। শয়তান হযরত হাজেরা কে ধোকা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো সফল হলনা। শয়তানী প্ররোচনায় ব্যর্থ হয়ে হাজেরার নিকট থেকে পালিয়ে গেল, এবার প্ররোচিত করার জন্য হযরত ইসমাঈল (🙂 নিকট উপস্থিত হলো, বললো, আপনার পিতা আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? হযরত ইসমাঈল (🙂 জবাব দিলেন পিতার বন্ধুর দাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। শয়তান বললো শুনো! তোমার পিতা তোমাকে যবেহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে ইসমাঈল (.) শয়তানের সাথে তর্কযুদ্ধ শুরু করলেন, বললেন অভিশাপ্ত শয়তান এখান থেকে দূর হয়ে যা। কোনো পিতা কি নিজ আদরের সন্তান কে যবেহ করতে পারে? শয়তান বললো তোমাকে যবেহ করার জন্য আল্লাহ হুকুম করেছেন তাই নিয়ে যাচ্ছেন আদর্শ পিতার অনুগত সন্তান হযরত ইসমাঈল (.) বললেন, যদি আল্লাহ যবেহ করার জন্য হুকুম দিয়ে থাকেন আমি আল্লাহর রাস্তায় যবেহ হয়ে যাব। এটা তো আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। এবার পরিশেষে অভিশপ্ত শয়তান হতাশ হয়ে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম’র নিকট উপস্থিত হলো, বললো হে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম! আপনি তো একটি স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে নিজের অপরূপ সুন্দর আদরের পুত্রকে যবেহ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন! এদিকে হযরত ইবরাহীম (.) মিনা প্রান্তরে রওয়ানা হলেন ওদিকে মরদুদ শয়তান জামরায়ে আকবার নিকট হযরত ইবরাহীম (.) মুখোমুখি হলো কুরবানী থেকে বিরত রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালো হযরত ইবরাহীম (.) শয়তানকে সাতটি পাথর ছুড়ে মারলেন এতে শয়তান কাবু হয়ে যায়। এবার শয়তান একটু এগিয়ে জমরায়ে উসতার নিকট রাস্তা অবরোধ করলো ইবরাহীম (.) আবারো সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন এতে শয়তান কাবু হয়ে যায়। আবার শয়তান জমরায়ে কুবরার নিকট উপস্থিত হয়ে পথরোধ করে দাড়িয়ে থাকে ইবরাহীম (.) আবারো সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। (তাফসীর রুহুল মা’আনী, বাহারে শরীয়ত, খন্ড: , পৃ: ১০১)

কংকর নিক্ষেপের ৩টি স্থানে শয়তানের উদ্দেশ্যে কংকর নিক্ষেপ করাকে হাজীদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে এস্থানে শয়তানকে দেখা যায় না কিন্তু জামারাত সমূহে কংকর নিক্ষেপ করা সুন্নতে ইবরাহীমি কে জীবন্ত রাখার অন্যতম স্মারক। (আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড: , পৃ: ৩৬৯)

কুরআন মজীদের আলোকে কুরবানীর তাৎপর্য:

পশু ক্রয়ের প্রতিযোগিতা বা লৌকিকতা নয় একমাত্র আল্লাহর রেজামন্দি লাভের উদ্দ্যেশেই সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানী করা উচিৎ। কুরবানী দাতার পশুর মাংস রক্ত কোনো কিছুরই আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন, বান্দার অন্তরের একমাত্র তাকওয়া ও ইখলাস আল্লাহর নিকট পৌঁছে, আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন, আল্লাহর নিকট তোমাদের কুরবানীর মাংস রক্ত কিছুই পৌছেনা, কিন্তু তোমাদের তাকওয়াই তাঁর নিকট পৌঁছে। (সূরা: আল মায়িদা, আয়াত: ২৮)

হাদীস শরীফের আলোকে কুরবানীর গুরুত্ব:

কুরবানী মুসলমানদের কেবলমাত্র ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নয়। এটি কুরআন সুন্নাহ নির্দেশিত একটি ওয়াজিব ইবাদত। উপরন্তু এটি সৈয়োদানা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম’র সুন্নাত তথা স্মৃতির স্মারক। অসংখ্য হাদীস শরীফে কুরবানীর ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, “হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ কুরবানী কি? রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেন, এটি তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর সুন্নাত, সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, এতে আমাদের কি কল্যাণ রয়েছে? নবীজি এরশাদ করেন, এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে বকরী দুম্বা ও ভেড়ার পশমের বিনিময়েও কি সওয়াব রয়েছে, নবীজি এরশাদ করেন, বকরী দুম্বা ও ভোড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও সওয়াব রয়েছে। (ইবনে মাযাহ, খন্ড: ২য়, পৃ: ২২৬, মিশকাত শরীফ, পৃ: ১২৯)

কুরবানী সংক্রান্ত জরুরী মাসআলা:

কুরবানী সময় হলো জিলহজ্বের ১০,১১ ও ১২ তারিখ, তিন দিন দুই রাত। এ সময়ের মধ্যে কুরবানী করতে সক্ষম না হলে তিনদিন পর ভেড়া, দুম্বা বা ছাগলের মূল্য পরিমাণঅর্থ সাদকা করে দেয়া ওয়াজিব। কুরবানীর দিন সমূহে কুরবানীর নিয়ত করে মোরগ মুরগী যবেহ করা মাকরুহ। (ফতোওয়ায়ে আলমগীরি, খন্ড: , পৃ: ১০৫)

তাকবীর তাশরীক:

জিলহজ্বের ৯ তারিখের ফজর থেকে ১৩ জিলহজ্বের আসর পর্যন্ত ফরজ নামাযের পর উচ্চস্বরে একবার তাকবীর পাঠ করা ওয়াজিব। তিনবার পড়া উত্তম। তাকবীর নিম্নরূপ:

আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর ওয়ালিল্লাহিল হামদ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরবানী দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী); খতীব,

কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

আনোয়ারুল আজীম

বহদ্দার হাট, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: আক্বীকা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান জানালে উপকৃত হব।

উত্তর: আক্বীকা করা সুন্নাত। ছেলে মেয়েদের আক্বীকার গুরুত্ব ও উপকারিতা হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। হযরত সালমান ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, নবজাত শিশুর আক্বীকা রয়েছে তোমরা তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করো। আর তাদের পক্ষ থেকে কষ্ট দায়ক বস্তু দূর করো। (মিশকাত, হাদীস নং: ১৯১৩৩)

নবজাত শিশু ছেলে হলে দুটি ছাগল, মেয়ে হলে একটি ছাগল আক্বিকা করবে। সন্তান জন্মের ৭ম দিনে আক্বীকা করা সুন্নাত। সম্ভব না হলে যে কোনো দিন করলেও সুন্নাত আদায় হবে। কোরবানীর সাথে আক্বীকা করা যাবে। গরু, মহিষ, উট দ্বারা করলে ছেলে হলে দুই অংশ, মেয়ে সন্তান হলে এক অংশ। সন্তান জন্মের ৭ম দিনে আক্বিকা করা, সন্তানের নাম করণ করা ও মাথার চুল মন্ডন করা উত্তম। (মিশকাত, পৃ: ২৬২)

আক্বিকার মাংস পিতা মাতা দাদা দাদী নানা নানী খেতে কোন নিষেধ নেই। (বাহারে শরীয়ত, খন্ড:১৫, পৃ: ১৫৫)

পূর্ববর্তী নিবন্ধআওয়ামী লীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাফল্য ও গৌরবের অভিযাত্রা
পরবর্তী নিবন্ধকাল বোধনের সুকুমার সন্ধ্যা টিআইসিতে