জিএম জহির উদ্দীনের ‘এক মুঠো প্রেম’

জসিম উদ্দিন খান | মঙ্গলবার , ১৯ মে, ২০২৬ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

জিএম জহির উদ্দীন একজন স্বভাবজাত কবি। লেখালেখির ক্ষেত্রে তার পদচারণা বেশ কিছু দিনের হলেও সামপ্রতিক সময়ে লেখালেখিতে তিনি খুব দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছেন। বিধ্বস্ত প্রেম বিপন্ন ভালোবাসা‘ (২০২৪) তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় ‘আকাশ জুড়ে রঙের মেলা’ (২০২৫) এবং ‘খোকার চোখে স্বপ্ন আঁকে‘ (২০২৫)। এর পরে আজকের আলোচ্য গ্রন্থ ‘এক মুঠো প্রেম’ (২০২৬) তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। তার কবিত্ব প্রকাশের ভাষা চমৎকার। শব্দের বুননে কবি যথেষ্ট কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার কবিতার বইয়ের সবগুলো কবিতা ধরে ধরে আলোচনার টেবিলে তুলে আনা কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। আমি কবির এই কাব্যগ্রন্থের ৪২ টি কবিতার মধ্যে কয়েকটি কবিতা নিয়ে আলোচনা করবো।

এক মুঠো প্রেম’ গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘দ্রোহের কবি’ একটি সনেট যেখানে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন ও সাহিত্যের দ্বৈত সত্তাকে তুলে ধরা হয়েছে। কপোতাক্ষ নদের তীরে জন্ম নেওয়া মাইকেল ধর্মান্তরিত হয়ে স্বজাতি ও জন্মভূমি ত্যাগ করেছিলেন শুধু নিজের সত্তার দ্রোহে, সনাতনী মূল্যবোধকে তিনি পুড়িয়েছেন আপন প্রতিভার আগুনে। কবি তাঁকে বীরত্বের প্রতীক বলেছেন, কিন্তু সে বীরত্ব ধর্মের নয়, জন্মভূমির প্রতি অনুরাগের: তাই রামের বিজয়ের দিনেও তিনি ‘উৎকৃষ্ট রাবণ’কে স্মরণ করেন, যা তাঁর ‘মেঘনাদবধ কাব্য’এর বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। কবি জানান, শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মাইকেলের কীর্তি অম্লান, তাঁর বেদনাময় নিঃসঙ্গতা আর ‘কাব্য সুধা’র বিনিময়ে প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার ট্র্যাজেডি আজও পাঠককে নাড়া দেয়। সব মিলিয়ে কবিতাটি মাইকেলের দ্রোহ, প্রতিভা, বিচ্ছিন্নতা আর বাংলা সাহিত্যে তাঁর অনিবার্য প্রভাবকে শ্রদ্ধা ও বেদনার মিশ্র সুরে তুলে ধরে।

প্রেম বিরহ বিদ্রোহকবিতায় কবি প্রেমের বহুমাত্রিক রূপকে একসাথে ধরার চেষ্টা করেছেন। কবির মতে, একটি কবিতা যেমন কেবল প্রেমের নয়, তেমনি তা শুধু বিরহেরও নয় বরং কখনো তা অর্ধ দ্রোহের মতো তীব্র অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। এই ভাবনার মধ্য দিয়ে কবি প্রেমকে একটি জটিল মানসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

নির্জন আঁধারকবিতায় কবি একই সাথে প্রকৃতি, অস্তিত্বের সংকট এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক সত্তার আর্তি রেখেছেন। কবিতার শুরুই প্রশ্ন দিয়ে: ‘সেদিন সকাল আর আসবে কি ফিরে?’

পুরো কবিতা জুড়ে এই ‘ফিরে আসা’ একটা কেন্দ্রীয় হাহাকার। সকাল, হরিণী, জীবন সবকিছু ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আর অনিশ্চয়তা কবিকে তাড়া করে। ‘নির্জন আঁধার’ শিরোনাম হলেও কবিতার জগৎ নির্জন নয়। বরং সেখানে বাঘের গর্জন, বুলেটের নল দুটোই আছে। অর্থাৎ বাইরের জগৎ হিংস্র, ভয়ংকর। আর এই হিংস্রতার বিপরীতে কবির আশ্রয় ‘মনের শরীর’।

কবির ‘বৃথা আয়োজন’ কবিতার মূল সুর হলো সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব আর জীবনের অপচয় নিয়ে এক গভীর আত্মদহন। কবি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে দিন, ক্ষণ, কর্মকাল কিছুই স্থায়ী নয়। কালের গহ্বরে যেন সব ডুবে যায়লাইনটি দিয়ে বোঝানো হয়েছে সময় সবকিছু গ্রাস করে ফেলে। দ্বিতীয় স্তবকে কবি নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করছেন। ‘বিনা কাজে’ বেলা গেছে, ‘সংকোচে লাজে’ বলতে না পারা, শুধু স্বপ্ন দেখেই জীবন কেটেছে।

আমার মনকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে যে কবিতাটি সেটি হচ্ছে ‘বিরহ দাও’। কবিতাটি একটা গভীর আত্মস্বীকারোক্তি, যেখানে কবি সুখের বদলে দুঃখকেই বরণ করে নিতে চাইছেন।

কবিতার কেন্দ্রে আছে একটা প্যারাডক্স। কবি প্রাপ্তি, সুখ, ফুলের পাপড়ি চান না। তিনি চান বিরহ, যাতনা, কাঁটা, আঘাত। কারণ এই যন্ত্রণাই তার সৃষ্টির জ্বালানি। সুখ তাকে নিষ্ক্রিয় করে, বিরহ তাকে কবি বানায়।

প্রাপ্তির বর্ণাঢ্য সুখ সে আমার নহে’শুরুটাই চমক। আমরা সাধারণত প্রাপ্তির সুখ চাই, কিন্তু কবি বলছেন, ওই রঙিন সুখ তার না। ‘আমাকে বিরহ দাও যাতনা দুঃসহ’এ যেন সরাসরি আবদার। অসহ্য যন্ত্রণা চাইছেন। ‘ফুলের পাপড়ি নয় কাঁটারই ঘায়ে / আমাকে আঘাত করো তোমরা প্রত্যহ‘- সুন্দর রূপক। ফুল মানে কোমলতা, প্রেম। কাঁটা মানে কষ্ট। কবি প্রতিদিন কাঁটার আঘাত চাইছেন।

কাঁদুক আমার প্রাণ বেদনা বিরহে / ঢালুক অশ্রুর ফোঁটা আমার নয়ন’। কান্না, চোখের জল এগুলোকে তিনি সাদরে গ্রহণ করছেন। ‘ভেঙে দাও খণ্ড খণ্ড আমার স্বপন / নতুন স্বপন আমি রচিব বিরহে‘- এটা সবচেয়ে শক্তিশালী লাইন। স্বপ্ন ভেঙে গেলেই তিনি নতুন স্বপ্ন রচনা করতে পারেন।

এটা কোনো সাধারণ প্রেমের বিরহের কবিতা না। এটা একজন স্রষ্টার স্বীকারোক্তি। অনেক শিল্পীর ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গভীর বেদনা বা ট্রমা থেকে তাদের সেরা কাজগুলো বের হয়। সুখ ও স্থিতি তাদের ভোঁতা করে দেয়। এখানে কবি সেই সত্যটাই নির্মমভাবে বলছেন, তিনি সুখ চান না, কারণ সুখ তার কলমকে থামিয়ে দেয়।

তিনি মূলত বলছেন যেন, ‘আমাকে কষ্ট দাও, যেন আমি লিখতে পারি। আমার কবিতা জন্ম নেয় চোখের জলে, রক্তে, ভাঙা স্বপ্নের টুকরো থেকে।’

এক মুঠো প্রেম’ কবিতাটির নামেই কাব্যগ্রন্থের নাম রাখা হয়েছে। বইয়ের নামকরণ কবিতা দিয়ে হলে বুঝতে হয় এই লেখাটাই বইয়ের আত্মা। আর এই কবিতা সেই দায়িত্ব ভালোভাবেই সামলিয়েছে।

কবিতাটা একই সাথে প্রেম, অভিমান আর জীবনবোধের মিশেল। প্রথম স্তবকে আছে ব্যক্তিগত আকুতি প্রিয়জনের মুখের দিকে চেয়ে থাকা, বুকে চোট লাগা, ‘তুমি এসে এক মুঠো প্রেম ফেললে না’ এই খেদ। দ্বিতীয় স্তবকে কবি ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে চলে যান বৈশ্বিক সত্যে। ‘জগতজুড়ে প্রেমের খেলা প্রেম মেলা / আমরা আছি মোহ মায়ার বন্ধনেই’। শেষ বেলা কেউ থাকে না, তবু কবি থেকে যান ‘মন খোলা’ নিয়ে, চন্দনের সুগন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

ভাষা ও ছন্দের মাপকাঠিতে বলা যায় কবিতাটা অনেকটা পয়ার ঘেঁষা, কিন্তু আটকে নেই। চিত্রকল্পও বেশ চমৎকার। ‘স্নিগ্ধ মুখের টোল’, ‘বুকে চোট লাগা’, ‘মোহ মায়ার বন্ধন’ একদম ঘরোয়া অথচ গভীর। ‘এক মুঠো প্রেম’ উপমাটা ছোট্ট কিন্তু ভারী। ভালোবাসা তো আসলে মুঠোভরেই চাই আমরা। ‘দাওনি কেন তখন তুমি জোর হানা?’ এই প্রশ্নে রাগ আছে, আবার শেষে ‘সখি, আমি আছি, আমি রব’ এ স্থিরতা আছে। এই বিবর্তনটাই কবিতাটাকে শুধু প্রেমের কবিতা থেকে জীবনবোধের কবিতা বানিয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালী লাইন– ‘তুমি এসে এক মুঠো প্রেম ফেললে না / কেউ কি এসে খবর নেবে; রই দুখে?’ এখানে প্রত্যাশা, শূন্যতা আর সমাজের উদাসীনতা তিনটা একসাথে ধাক্কা দেয়।

আর শেষ দুই লাইন: ‘সুগন্ধ চাও? রইলো দেখ, চন্দনেই।’ অভিমানের পরেও নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার যে ঔদার্য, সেটা পুরো কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কবি এখানে আর প্রার্থী না, দাতা।

জি এম জহির উদ্দীন এর ‘এক মুঠো প্রেমশুধু প্রেমের কাব্য নয়, এটি একইসঙ্গে আত্মানুসন্ধান, সময়চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের দলিল। তার শব্দচয়ন, চিত্রকল্প আর অনুভূতির গভীরতা পাঠককে সহজেই ছুঁয়ে যায়। ‘বিরহ দাও’ এর মতো কবিতায় যে নির্মম আত্মস্বীকারোক্তি আছে, আবার ‘এক মুঠো প্রেম’ এ যে দাতা হয়ে ওঠার ঔদার্য আছে, এই দুই মেরুর টানাপোড়েনই তাকে আলাদা করেছে। যত অন্ধকার, যত বিরহই আসুক, তিনি হৃদয়ের ভেতর এক মুঠো প্রেম জমিয়ে রাখেন এবং তা পাঠকের হাতে তুলে দেন। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ।

লেখক : কবি, গীতিকার, ব্যাংকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্মার্টফোন হাতে, কিন্তু কতটা নিরাপদ আমাদের অভিভাবকেরা?
পরবর্তী নিবন্ধনৈতিকতার ইতিবাচক চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি