জাতীয় বাজেটে কী পেল নারী?

| শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ

গৃহকর্মী পারুল আকতার বেশ কয়েকদিন ধরেই প্যানপ্যান ঘ্যানঘ্যান করছেই। আন্টি, কীভাবে চলবো সব জিনিস এর দাম বাড়তি। কী খাবো? কীভাবে বাচ্চাদের পড়াশোনা চালাই নেবো, বুঝতে পারছি না। ঘর ভাড়া বাড়াইছে, কারেন্টএর দাম বাড়াইছে, অথচ কারেন্ট থাকে না, রাতে ঘুমাতে পারি না মশার জ্বালায়। এই হলো একজন তৃণমূল নারীর জীবনের কঠোর বাস্তবতা। কিছুদিন আগেই আমাদের ২০২৬২৭ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা হলো। এই বাজেটে নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় সুবিধা বাড়ানো হলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব এবং জীবন যাত্রার বাড়তি খরচের সাথে সামঞ্জস্য না থাকায় সার্বিক সুবিধাগুলো অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে। বর্তমান বাজেটে ৫ টি ধাপে নারীদের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ১. সরাসরি বরাদ্দ, নারী ও শিশু উন্নয়ন খাত, .কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার ৩. সামাজিক নিরাপত্তা ৪. সুরক্ষা ৬. ট্যাক্স। সরাসরি বরাদ্দে রয়েছে আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা। কর্মজীবী নারীদের ডে কেয়ার সেন্টার প্রথম ধাপে ২০ টি, পরের ধাপে আরো ৬০ টি মোট ৮০ টি। যাতে কর্মজীবী নারীরা বাচ্চা রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন। সামাজিক নিরাপত্তার মাঝে রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া, বিদেশ ফেরত নারীদের পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি এবং এসএমই ফাউন্ডেশনে অতিরিক্ত ৫০ কোটি বরাদ্দ। সুরক্ষায় রয়েছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের কুইক রেসপন্স টিমকে আরো শক্তিশালী করা এবং এডিপিতে প্রাধান্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নকে বিশেষণ অগ্রাধিকার দেয়া। অন্যটা হলো ট্যাক্স। ট্যাক্সএর দিক থেকে স্বর্ণ বিক্রিতে ১৫% গেইন ট্যাক্স শুধু নারীর জন্য নয়, সবার জন্য।

বিশিষ্ট লেখক ও আগ্রাবাদ মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম বলেন, আমরা আগেও দেখেছি বাজেটে নারীদের জন্য কিছু ফ্যাসিলিটি থাকে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়না। প্রথমত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানএ নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে অতীতে সুবিধাগুলো যে পরিমাণ ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে মনিটরিং বাড়িয়ে আরো যাতে বরাদ্দ রাখা যায়, সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে স্কুলগুলোতে স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষি নারী কর্মী, এবং গার্মেন্টস নারী কর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ট্যাক্স খাতে স্বর্ণের যে গেইনার দেয়া হয়েছে, সেটি নারীদের কল্যাণে কতটুকুন সহায়ক হবে, তাও বিবেচনায় আনা জরুরি। নারীর প্রতি চলমান সহিংসতায় কীভাবে নারীর জীবন সুরক্ষিত করা যায়, সেটিও কঠোর আইনের আওতায় আনতে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। আমাদের নারী সমাজের গেরস্থালি কাজ এর স্বীকৃতি বরাবরই অবহেলিত। এই শ্রম আর মেধাকে মূল্যায়নের জন্য বিশেষ প্রণোদনা রাখা এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি করে বিনিয়োগ খাতে তাদের উৎসাহিত করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টারের উপর গুরুত্ব দেন তিনি।

চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আবিদা মোস্তফা বলেন, নারী ও প্রতিবন্ধী উদোক্তাদের জন্য করমুক্ত বার্ষিক আয় সীমা, ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাজেটে এস এমই খাতে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তিনি বলেন, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিগত ব্যবসার জন্য টার্ন ওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ নির্ধারণ ও স্থানীয় লেনদেনে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব নতুন প্রজন্মের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে। আমরা দেখি বাজেটে নারীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা খাতে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা খাতে গ্রামীণ নারীদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও স্যানিটারি প্যাডের উপর সহজলভ্যতার বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। উদ্যেক্তা উন্নয়ন খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল ও এসএমই খাতে ঋণ সুবিধা এবং কিছু ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ও ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা রয়েছে। তবে এসব সুবিধাগুলো বাস্তবায়নে রয়েছে নানান সমস্যা ও জটিলতা। জেন্ডার বাজেটের বেশিরভাগ উন্নয়ন বরাদ্দ অবকাঠামোগত খাতে চলে যায়। যা সরাসরি প্রান্তিক নারীদের কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সামাজিক নিরাপত্তা ও বিধবা ভাতার পরিমাণ এখনো অপর্যাপ্ত। ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতার কারণে খুব সহজে ব্যাংক ঋণ বা প্রণোদনা পান না। এই সুবিধা নিতে নারীদের বেশ বেগ পেতে হয়। মূলত নারীবান্ধব নীতির ঘাটতি, পুরুষ নীতির প্রাধান্য, অর্থায়নে সীমিত প্রবেশাধিকার ও সম্পত্তির মালিকানার অভাব ও পুরুষ নির্ভর আর্থিক কাঠামো, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বাধা নারীদের উদ্যোক্তা হবার প্রধান অন্তরায়। অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন এসব সুবিধা কেবল বাড়ালেই হবেনা, অর্থায়ন ও নীতিমালায় কাঠামোগত মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের জেন্ডার ও শিক্ষা সংক্রান্ত অংশটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫ থেকে ৪৯ বছর নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার রক্ষায় স্যানিটারি খরচ সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দেখা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্কুল কলেজে ছাত্রীদের ধরে রাখতে এবং পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্যচর্চায় একটি যুগান্তকারী ও নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং সরকারি বেসরকারি শিল্প হাবে স্বয়ংক্রিয় হেলথ এন্ড হাইজিন ভ্যান্ডিং মেশিন স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এর পাশাপাশি জেন্ডার সমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পাবলিক প্লেসে নারীদের জন্য পৃথক ওয়াশরুম ও টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত এবং গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, কর্পোরেট অফিস ও আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপদ “ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার” বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সচেতন নারী সমাজ এবং ভুক্তভোগী নারী এই সুবিধাগুলোর সঠিক প্রয়োগ ও দ্রুত বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় আছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্বর্ণকন্যা রূপকথার বিশ্বজয় রাশিয়ার মঞ্চে মুন্সিগঞ্জ থেকে মস্কো
পরবর্তী নিবন্ধবাঁশখালীতে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১