জাকাতের টাকায় অভাবী ঋণগ্রস্তকে ঋণমুক্ত করে দেওয়া খুবই উত্তম পন্থা। অন্যদিকে কাউকে ঋণ দিয়ে বিপদে পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত ও উৎকৃষ্ট আমল। এটি আল্লাহর কাছে উত্তম বিনিয়োগ করার মতো। কোরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে-‘কে আছে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন।’ (সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৪৫)। এই আয়াতের একাধিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আছে। তবে একটি ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার একটি অর্থ এও বলা হয়েছে যে তাঁর বান্দাদের ঋণ দেওয়া এবং তাদের অভাব পূরণ করা। কেননা প্রিয় নবী (দ.) বলেছেন-‘কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে দুইবার ঋণ দিলে সে সেই পরিমাণ সম্পদ একবার দান–খয়রাত করার সওয়াব পায়। (ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৪৩০)। জাকাত দেওয়ার আটটি খাত কোরআন মজিদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে– ‘জাকাত তো শুধু নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও জাকাতের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য (জাকাত সংগ্রহকারী ব্যক্তিদের পারিশ্রমিক হিসেবে), যাদের মনোরঞ্জন উদ্দেশ্য (অসহায় নও মুসলিম) তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরের জন্য। এ আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তাওবা, আয়াত ৬০)।
অনেক দরিদ্র গরিব অভাবী ও ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি আছেন, যারা অভাব অনটনে জর্জরিত এবং বহু টাকা ঋণগ্রস্ত–তারা চক্ষুলজ্জার কারণে কারো কাছে হাত পাতেন না, নিজের ঋণগ্রস্ততার কথা কাউকে বলেন না এমন অসহায় ঋণগ্রস্ত খুঁজে খুঁজে জাকাতের টাকায় তাদেরকে ঋণমুক্ত করাই ইসলামের নির্দেশনা। কোরআন মজিদে বর্ণিত ‘গারিমিন’ তথা ঋণগ্রস্তকে জাকাত প্রদানে খুবই উৎসাহিত করা হয়েছে। লেনদেনের ক্ষেত্রে মানুষকে ছাড় দেয়া উত্তম। বিশেষত নির্ধারিত সময়ে ঋণগ্রহীতা ঋণ প্রদানে অক্ষম হলে তাকে সুযোগ দেয়া উচিত। আল্লাহতায়ালা বলেন, -‘আর ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি অভাবী হয়, তাকে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি ঋণ মাফ করে দাও, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য আরো উত্তম, যদি তোমরা তা জানতে।’ (সূরা বাকারাহ, ২৮০)। বুরায়দা আল আসলামী (রাদ্বি.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী (দ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অভাবী ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে ছাড় দেবে, সে ছাড় দেওয়া প্রতিদিনের বিনিময়ে সদকার সওয়াব পাবে। যে ব্যক্তি ঋণ শোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সময় বাড়িয়ে দেবে, সেও প্রতিদিনের বিনিময়ে সদকার সওয়াব পাবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪১৮)। অন্য হাদিসে ঋণ মওকুফ করায় ক্ষমা লাভের কথা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুয়াররা (রাদ্বি.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী (দ.) ইরশাদ করেছেন, এক ব্যক্তি কখনো ভালো কাজ করেনি, মানুষের সঙ্গে তার লেনদেন ছিল। সে তার প্রতিনিধিকে বলেছিল, তুমি যতটুকু সহজ ততটুকু করবে এবং কঠিন মনে হলে ছেড়ে দিবে। আর মাফ করে দেবে। হয়তো আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন। মৃত্যুর পর আল্লাহ তাকে বলেন, তুমি কি কখনো কোনো ভালো কাজ করেছো? সেই ব্যক্তি বলল–না। তবে আমার একজন দাস ছিল। মানুষের সঙ্গে আমার লেনদেন ছিল। আমি দাসকে পাঠানোর সময় বলতাম, সামর্থ্যবান থেকে গ্রহণ করবে, আর অক্ষমদের অংশ ছেড়ে দেবে এবং ক্ষমা করবে। আল্লাহপাক বলেন, ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম’ (ইবনে হিব্বান ৫০৪৩)। ঋণগ্রস্তকে জাকাতের টাকায় ঋণমুক্ত করা একটি বড় সুযোগ। কোরআন মজিদের নির্দেশনা অনুযায়ী জাকাতের বড় হকদার ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা। তা যেন বিত্তবান জাকাতদাতারা মনে রাখেন। অন্যদিকে ‘করজে হাসানা’ বা সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের নির্দেশনাও দিয়েছেন মহান আল্লাহপাক। দেশ ও সমাজে ব্যাপকভাবে সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার সংস্কৃতি চালু হওয়া প্রয়োজন। একটি গণকল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠায় তা বড় জরুরি।











