চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মাঝে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
২০২০ সালে (এক বছরে) জরুরি বিভাগে চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়- এক বছরে (২০২০ সালের জানু-ডিসেম্বর পর্যন্ত) মোট ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮০ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। এর মাঝে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা ২৭ হাজার ৫১৯ জন। যা মোট রোগীর ১৭ শতাংশ। চিকিৎসা সেবা গ্রহণে এরপরই রয়েছে বুকের ব্যথা, তলপেটে ব্যথা ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা নিয়ে আসা রোগীরা। এক বছরে বুকের ব্যথা (চেস্ট পেইন) জটিলতায় এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪ হাজার ২৮২ জন। যা মোট রোগীর ১৫ শতাংশ। তলপেট ব্যথা (এবডোমেন পেইন) জটিলতায় সেবা নেয়া রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ৪৪ জন। শতকরা হিসেবে এটি মোট রোগীর ১৩ শতাংশ। আর শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা নিয়ে চিকিৎসা সেবা নেয়া রোগীর হার মোট রোগীর ১০ শতাংশ। সংখ্যায় যা ১৬ হাজার ১৮৮ জন। এছাড়া করোনা উপসর্গ নিয়ে ১০ শতাংশ (১৬ হাজার ১৮৮ জন), ডায়রিয়া ও মূত্রনালীর জটিলতায় ৭ শতাংশ (১১ হাজার ৩৩১ জন) করে, বিষ খাওয়া ৫ শতাংশ (৮ হাজার ৯৪ জন), পানিতে ডুবে এবং সাপে কাঁটা ১ শতাংশ (১ হাজার ৬১৮ জন) করে রোগী এক বছরে সেবা নিয়েছেন জরুরি বিভাগে।
জরুরি বিভাগে এক বছরে সেবা গ্রহণ করা মোট ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮০ জন রোগীর মধ্যে পুরুষ রোগী সেবা নিয়েছেন ৮৮ হাজার ৯২০ জন। আর সেবা নেয়া নারী রোগীর সংখ্যা ৭২ হাজার ৯৬০ জন। হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী- জরুরি বিভাগে মোট ৯ জন চিকিৎসক ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিন শিফটে রুটিনের ভিত্তিতে তাঁরা রোগীদের সেবা দেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী বেশি আসার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা বা যে কোন দুর্ঘটনায় আহতদের হাসপাতালগুলোতে ‘অস্বাভাবিক’ রোগী হিসেবে দেখা হয়। এসব রোগীর কাগজপত্রে ‘পুলিশ কেইস’ উল্লেখ করা থাকে। আর এক্ষেত্রে পুলিশি জটিলতাসহ বাড়তি ঝামেলার আশঙ্কায় অন্যান্য হাসপাতালগুলো এধরণের রোগী ভর্তি নিতে চায়না। যত দ্রুত সম্ভব এসব রোগীকে চমেক হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয়। এমনকি চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও সেবা না দিয়ে রোগীকে রেফার করে দেয়া হয়। যার কারণে অনেক দূরাঞ্চলে সংঘটিত দুর্ঘটনায় আহত রোগীকেও এখানে নিয়ে আসা হয়। মূলত এসব কারণেই চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনার রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন পুলিশ পরিদর্শক মো. জহিরুল হক ভূঁইয়া। দীর্ঘ সময় ধরে চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। একটু আহত হলেই রোগীকে চমেক হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয় জানিয়ে পুলিশ পরিদর্শক মো. জহিরুল হক ভূঁইয়া বলেন, মাঝে-মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে কয়েকটা রোগী অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি নেয়। যদিও রোগীর অবস্থা গুরুতর না হলে বা ‘নরমাল’ হলে ওই ধরনের রোগীকে ভর্তি নেয়ার কথা শোনা যায়। তাও খুব ব্যতিক্রম। সবসময় নেয়া হয়না।
প্রসঙ্গত, একটি হাসপাতালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ধরা হয় জরুরি (ইমার্জেন্সি) বিভাগকে। সংকটাপন্ন রোগীকে জরুরি চিকিৎসার আশায় প্রথমে নিয়ে আসা হয় এই জরুরি বিভাগেই। কিন্তু এতদিন জরুরি চিকিৎসার কোন সরঞ্জামই ছিলনা চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে! শুধু সরঞ্জামই নয়, ছিলনা একজন কনসালটেন্টও! প্রতি শিফটে মাত্র একজন মেডিকেল অফিসার পদের চিকিৎসক দিয়েই চলছিল জরুরি বিভাগের এ সেবা। ১৯৬০ সালে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এভাবেই চলে আসছিল।
আগে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে একজন রোগী আসার পর যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে রোগীটিকে পাঠানোর কাজটি করে থাকতেন চিকিৎসকরা। এছাড়া গুরুতর নয়, এমন রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। আর দুর্ঘটনায় আহতদের প্রাথমিকভাবে ব্যান্ডেজ ও ড্রেসিং সেবাটা দেয়া হতো। বছরের পর বছর ধরে মূলত এভাবেই সেবা দিয়ে আসছিল জরুরি বিভাগ! তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগকে (ইমার্জেন্সি) সমপ্রতি ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারে রুপান্তরিত করা হয়েছে। যেখানে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আদলে রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের কথা বলছে হাসপাতাল প্রশাসন। গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারের সেবা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে জরুরি বিভাগের সেবার ধরণে আমূল পরিবর্তন এসেছে জানিয়ে চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর আজাদীকে বলেন, আগে কিন্তু জরুরি বিভাগে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। যার কারণে চিকিৎসা সেবায় বেশি কিছু করার সুযোগ ছিলনা। তবে এখন জরুরি বিভাগের নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি সেবার ধরণেও আমূল পরিবর্তন এসেছে।
হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী- ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারের অভজারেভশন সেলে ৫০টিসহ রোগীদের জন্য সবমিলিয়ে ৮০টি শয্যা রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা চিকিৎসা সেবায় স্থাপন করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কর্ণার। এছাড়া হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্যও রাখা হয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। জরুরি রোগ নির্ণয়ে যুক্ত করা হয়েছে বেশ কয়টি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম। এর মধ্যে আলট্রাসনোগ্রাম, ইকো কার্ডিয়াগ্রাম, পোর্টেবল এক্স-রে, ইসিজি ও এনালাইজারসহ অন্যান্য বেশ কয়টি সরঞ্জাম রয়েছে। চিটাগাং ক্লাবের পক্ষ থেকে এসব চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। শয্যাসহ সবমিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছেন ক্লাবটির (চিটাগাং ক্লাব) সদস্যরা। এখন জরুরি বিভাগেই এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা পাচ্ছেন রোগীরা। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আগের মতো ওয়ার্ডে-প্যাথলজিতে ঘুরতে হচ্ছেনা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবায় মেডিসিন, সার্জারি, কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিক এবং অ্যানেসথেসিয়াসহ প্রয়োজনীয় সব বিভাগের একজন করে কনসালটেন্ট সার্বক্ষণিক (শিফট ভিত্তিতে) নিয়োজিত রাখার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন। চিকিৎসকদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা কক্ষ। এছাড়া দুটি অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও পর্যায়ক্রমে ৪টি আইসিইউ শয্যা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারে।