ছড়ার সমকালীনতা : আজকের ছড়াশিল্পীরা

আজিজ রাহমান | শনিবার , ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

.

ছড়াকে আমরা প্রায়ই ছোটোদের মনোরঞ্জনের জন্য লেখা মজার ছন্দের পঙ্‌ক্তি হিসেবেই দেখি। কিন্তু ছড়া কখনোই খেলনা ছিল না। কেবল হাসানোর উপকরণও নয়। ছড়া ছিল সময়ের সঙ্গে কথা বলার সরল অথচ শক্তিশালী এক ভাষাযার নিজস্ব ছন্দ, ইশারা ও বাস্তববোধ রয়েছে।

বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন– ‘সাহিত্যকে শিশু বা বড়দের নামে ভাগ করা এক ধরনের ভ্রান্তি; ভালো সাহিত্য সবার জন্যই।’ এই মন্তব্য ছড়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা, শিশু ছড়া পড়ে আনন্দ পায়, প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক সেখানে সমাজ, মনস্তত্ত্ব ও সময়ের চাপ অনায়াসেই আবিষ্কার করতে পারেন। এই দ্বিস্তরীয় পাঠযোগ্যতাই ছড়াকে সাহিত্য উপযোগী করে তোলে।

.

লোকছড়া থেকে আধুনিক ছড়াসবখানেই সময়ের ছাপ স্পষ্ট। দুর্ভিক্ষে এসেছে অভাব, যুদ্ধ ও আন্দোলনে ভয় ও প্রতিরোধ, গ্রামীণ ছড়ায় প্রকৃতি ও শ্রম, শহুরে ছড়ায় নাগরিক ও সামাজিক আচরণ। এমনকি রাজনৈতিক সংকটেও ছড়ায় উঠে এসেছে এক সাহসী ইঙ্গিত। অন্নদা শংকর রায়ের ভাষায়, ‘ছড়া লেখার উপকরণ আসে সমসাময়িক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে।’ তাই ছড়ার একটি প্রধান গুণ সমকালীনতা। প্রশ্ন হলোআজকের বাংলাছড়া সেই সমকালকে কতটা ধারণ করতে পারছে?

.

এই পর্যায়ে সমকালীনতাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করি। সমকালীনতা মানে শুধু আধুনিক শব্দ জুড়ে দেওয়া নয়। মোবাইল, ইন্টারনেট বা চলতি ঘটনার নামোল্লেখে ছড়া সমকালীন হয় না। তখন ছড়া স্লোগান বা উপদেশে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন– ‘কালকে ধরা যায় না খবরের কাগজে, ধরা যায় শিল্পের ভেতরে।’ ছড়ার ক্ষেত্রেও সমকালীনতা হলো অনুভবের ধরন। আজকের শিশুর জীবনযাপন, চারপাশের বদলে যাওয়া মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ ও আচরণএই অভিজ্ঞতাগুলো শিল্পের ভেতর নীরবে ধরা পড়লে ছড়া সমকালীন হয়।

আজকের ছড়ায় দুটো চরম প্রবণতা দেখিএকদিকে সমকাল এড়িয়ে যাওয়া ছড়া। এখানে রাজামন্ত্রীহাতিঘোড়ার কল্পজগৎ প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে সমকাল চাপিয়ে দেওয়া ছড়া। যাতে মোবাইল, কম্পিউটার, সমকালের রাজনীতি, সামাজিক বক্তব্য আসে সরাসরি কিংবা ভারী হয়ে। দুটোই শিশুকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ছড়া মূল পাঠককে হারায়। এই দুইয়ের মাঝখানেই সফল সমকালীন ছড়ার জায়গাযেখানে সমকাল আসে ইশারায়, ভাষা থাকে খেলাচ্ছলে, আর শিশুই থাকে মূল কেন্দ্রে। এখানেই আমরা সুকুমার বড়ুয়ার ধারায় পৌঁছাই।

. সুকুমার বড়ুয়া সমকালীন ছড়ার নীরব মানদণ্ড : সমকালীন বাংলা ছড়ায় সুকুমার বড়ুয়া একটি অনিবার্য নাম। তিনি প্রযুক্তি বা সমাজের কথা সরাসরি বলেন না, তবু তাঁর ছড়া পড়লেই আজকের সময় ধরা পড়ে। শিশুর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, সামাজিক ভদ্রতার মুখোশ ও স্বপ্নবাস্তবের টানাপোড়েনসবই হাসির আড়ালে উঠে আসে। তাঁর একটি বিখ্যাত ছড়া ‘তিনি হেসে বললেন/ ঠিক আছে ঠিক আছে’ এই সাধারণ বাক্যেই লুকিয়ে আছে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি। শিশু হাসে। বড়রা থমকে যায়। এই নীরব সামাজিক ইশারা তাঁর ছড়ায় বারবার ফিরে আসে। তাঁর এমন জনপ্রিয় ছড়া অগনিত। ‘নেই’, ‘অমুক’, ‘শিয়াল মন্ত্রী’, ‘ভেজাল’এর মতো ছড়াগুলোয় সমাজ ও ক্ষমতার ব্যঙ্গ আসে ইশারায়। এরকম অসংখ্য ছড়া রয়েছে। সবখানেই সমকাল অনুভবে ধরা পড়ে, বক্তব্যে নয়। এমন কি শিশু থেকে সরে যাওয়া নয়, বরং শিশুর চোখ দিয়েই সময়কে দেখা। আজকের ছড়াশিল্পীদের জন্য এটি একটি মানদণ্ড।

. উত্তরাধিকার : সমকালীন ছড়াশিল্পীরা : বাংলাছড়া কখনো একরেখায় চলে না। সে খেলতে খেলতে বাঁক নেয়। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায় এই বাঁক নেওয়ার সাহস স্পষ্ট ছিল। তাঁর ছড়ায় কল্পনা মুখ্য, কিন্তু তা বাস্তববিচ্ছিন্ন নয়। খেলাচ্ছলতা, ছন্দ আর বুদ্ধির মেলবন্ধনে তিনি দেখিয়েছিলেনছড়া শুধু মজা নয়, ভাবনাও। আজকের শিশুর কল্পনাও গড়ে উঠছে সমকালীন বাস্তবতায় আর তা ধরার চেষ্টা করছেন আজকের ছড়াশিল্পীরা।

বহুমাত্রিক ছড়াশিল্পী লুৎফর রহমান রিটনের ছড়ায় শিশুর দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক অসংগতি ধরা পড়ে। ‘হাবু বেশ বড়সড় / গাবুটা তো পিচ্চি/ হেরে গিয়ে হাবু বলে,/ উৎসাহ দিচ্ছি।’ (হাবু আর গাবু)। ছড়াটিতে বন্ধুত্ব ও পরাজয় ঢাকার মানসিকতা একসঙ্গে প্রকাশ পায়। তাঁর আরেকটি জনপ্রিয় ছড়া– ‘আবদুল হাই/ করে খাই খাই/ এক্ষুনি খেয়ে বলে/ কিছু খাই নাই।’ (খিদে)। এ ছড়ায় ‘খাই’ শব্দটি শিশুর আনন্দ আর বড়দের লোভদুই অর্থেই কাজ করে। লুৎফর রহমান রিটনের অসংখ্য ছড়া হাসাতে হাসাতে সম্পর্ক, অভ্যাস ও সমাজের দিকেও চোখ ফেরায়।

শিশুসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র আমীরুল ইসলামের ছড়ায় সরলতার ভেতর সামাজিক ভয় ও স্বপ্ন মিশে থাকে। ‘সবকিছুতেই না না/ কারণ আমি ছোট্ট পুতুল/ বিদেশ থেকে আনা।’ (পুতুল)। ‘পুতুল’এ ভোগ্যবস্তু হয়ে ওঠার ইঙ্গিত, অন্য একটি ছড়া ‘একটা বেড়াল/ ছোট্ট বেড়াল/ গোঁফ নাচিয়ে/ চোখ পাকিয়ে/ লম্ফ দিয়ে/ ঝম্প দিয়ে/ সেও হতে চায়/ মস্ত বাঘের বাচ্চা/ বাঘ শুনে কয়, আচ্ছা।’ (বেড়াল)। ‘বেড়াল’এ ছোটোর বড় হওয়ার আকাঙক্ষায় বড়দের ঠাট্টা। আমীরুল ইসলামের এরকম অগণিত ছড়ায় কৌতুক আর ব্যঙ্গ সমকালীন বাস্তবতার পরিচয় বহন করে।

তপংকর চক্রবর্তীর ছড়ায় বদলে যাওয়া সময়ের ছবি স্পষ্ট। ‘পদবিটা মীর ছিল/ হাট থেকে ফিরছিল/ ভেবে ভেবে একা একা/ চুল টেনে ছিঁড়ছিল।’ (পরিবর্তন)। ব্যঙ্গ আছে, মজা আছে তাঁর ছড়ার পরতে পরতে।

সুজন বড়ুয়ার ছড়া নরম ভাষায় তীক্ষ্ন ইশারা দেয়। বাজারে জিনিসের দাম আগুন। বাবা খালি হাতে ফিরলে খোকন বলে, ‘আগুন দেখে তুমি কিনা/ ফিরলে বাড়ির দিকে/ খবর দিলেই পারতে বাবা/ দমকল বাহিনীকে।’ (বাজার ভাবনা)

অজয় দাশগুপ্ত হাস্যরসের আড়ালে মূল্যবোধের সংকট তুলে ধরেন। ‘আলুর দোষ’এ দোষ চাপানোর প্রবণতা, ‘সূর্য তাপে গরম বালু/ তবুও শুধু বালুর দোষ/ যা কিছু হয় খালা বলে/ সকল কিছুই খালুর দোষ।’ (আলুর দোষ)

জাহাঙ্গীর আলম জাহানের ছড়ায় শিশুর বুদ্ধি, কৌতূহল আর নানা সামাজিক অনাচারের চিত্র সহজ ছন্দে ও হাস্যরসে প্রকাশিত। ‘গোল্লা আমি ঠিক খেয়েছি/ ফেলেছি তার বিচি/ তোমরা আমায় বোকা ভাব/ শুধুই মিছিমিছি।’ (রসগোল্লার বিচি)। উৎপলকান্তি বড়ুয়ার ছড়ায় প্রকৃতি ও সম্পর্কের উষ্ণতা হাসি ও ছন্দের ভেতর প্রকাশ পায়। ‘হুড়ি কয় হুড়ো-/ তুই খাবি লেজ আর/ আমি খাবো মুড়ো।’ (হুড়োহুড়ি)। জসীম মেহবুবএর ছড়ায় শিশুর কৌতূহল ও দৈনন্দিন মুহূর্তকে গল্পের ঢঙে ধরে। ‘কুসুম খোঁজে কুসুমপরি/ কুসুম পাবে কই?/ কুসুম চাখে বিল্লিছানা/ খাটের নিচে ওই।’ (কুসুমপরি)

আহমেদ জসীমের ছড়ায় কৌতুকের মধ্যেই লোকজ জীবনের উষ্ণতা আছে। ‘কোথায়/ পানবাতাসা পাবি?/ তোরা/ উল্টো রথে যাবি।’ (হলুদ মাখা গা)। ফারুক হোসেনের ছড়ার খেলায় সমকাল জড়িয়ে থাকে। যেমন থাকে মজার ভঙ্গিতে অন্ধ নির্দেশ মানার সংস্কৃতি। ‘এক কথাতেই দেয়নি নিচে লাফ/ বললো তখন, এবার করুন মাফ।’ (এক কথাতেই)

অরণ শীলের ছড়ায় আনন্দময় কল্পনার ভেতর ভয় ও সামাজিক চাপের সংঘাত ধরা পড়ে। ‘মাঝরাতে তেলাপোকা মেলে পাখা যেই/ মাকড়সা বলে তোর কোনো জ্ঞান নেই? …. বোকাসোকা তেলাপোকা বকাঝকা খেয়ে/ সড় সড় নেমে আসে আলমারি বেয়ে।’ (তেলাপোকা)

রাশেদ রউফের ছড়াগুলো অল্প কথায় বড় সংকট তুলে ধরে। জীবনের ছোটখাটো অভ্যাস, মানুষের অহংকার, অজ্ঞতা, স্বার্থপরতা ও মধ্যবিত্তের অবরুদ্ধতাসবই সূক্ষ্ম ব্যঙ্গে ও বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসে উঠে আসে। ‘রাস্তা তোমার চতুর্দিকে/ বন্ধ-/ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকো তুমি-/ নইলে সোজা অন্ধ।’

আনজীর লিটনের ছড়ায় শিশুমন ভর করে থাকে। অল্প শব্দে কৌতুক তৈরি হয়। ‘আইসক্রিম/ এটা যদি থাকত গরম/ তবে হতো ঘোড়ার ডিম।’ (তিন কথার ছড়া)। রোমেন রায়হানের ছড়া শব্দে, ছন্দে ও উপস্থাপনায় মজা করার ভঙ্গি অতুলনীয়। ‘ছোট হওয়ার যন্ত্রণা কী! বুঝবে না তা জাতি!/ সন্ধ্যা হলো! এখনই যা, জ্বালা ঘরের বাতি!’ (ছোট হওয়ায় আনন্দ নাই)

সারওয়ারউলইসলামের ছড়া ছন্দের কারুকাজে সমাজ, নৈতিকতা ও নাগরিক চেতনার প্রশ্ন তোলে। ‘চৌধুরী সাহেবের সবই আছে, কী যে নাই/ গতকাল শুনলাম মারা গেছে, নিজে নাই।’ (পরের জায়গা পরের জমি)

মিজানুর রহমান শামীমের ছড়া তালমাত্রার নাচন তোলে আয়না ধরে। যে আয়নায় হাসতে হাসতেই নিজের সময়কে চিনে নিই। ‘দেখছো যা সব জবর দখল/ কোনো কিছুই আমার না।’ (কোনো কিছুই আমার না)

ব্রত রায়ের ছড়া মজা করতে করতে বাস্তবে ভর করে। যেখানে অকালে বড় হয়ে যাওয়া রূপক হয়ে ওঠে। ‘ফলফলাদি পাকছে পাকুক/ সমস্যা নেই ফাইন/ সমস্যা হয় কমবয়সে/ পাকলে পোলাপাইন!’ (পাকনামি)

অদ্বৈত মারুতের ছড়া খেলাচ্ছলে বাস্তবের কঠিন সত্যে পৌঁছে দেয়। ‘লাটিম ঘোরে, আমরা ঘুরি/ আড়াল থেকে কে যে/ ট্রাজেডি এইএ খেলাটা/ খেলছে পশু সেজে।’ (সম্প্রীতির ছড়া)

রমজান মাহমুদের ছড়ায় শব্দের খেলা আছে, কিন্তু তা ফাঁকা নয়। ছন্দের আনন্দের ভেতরেই উঠে আসে জীবনের জটিলতা। ‘এক কলমে লিখলে কিছু/ সাদা হয়ে যাচ্ছে।/ এক জীবনের অঙ্ক কারো/ ধাঁধা হয়ে যাচ্ছে।’ (ধাঁধা)

আহমেদ সাব্বির হাসির ভেতর আচরণচিত্র আঁকেন। ‘বোয়াল মাছের চোয়াল ধরে/ রুই দিলো যেই ঝাঁকি/ খলসে বলে মানইজ্জত/ রইলো না আর বাকি।’ (ঝগড়া)

. হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, ‘ছড়া আজকাল অনেক বদলে গেছে। তাঁরা (ছড়াশিল্পীরা) স্বপ্নের ফুল ফোটানোর সাথে সাথে বাস্তবের আগুনও জ্বালাতে চান।’ উল্লিখিত ছড়াগুলো তাই জ্বালিয়েছে। এবং প্রমাণ করেসমকালীন বাংলা ছড়া সংকটে নয়, রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একক সুর ভেঙে তৈরি হয়েছে বহুস্বর। এই ধারার শিকড় দাঁড়িয়ে আছে সুকুমার বড়ুয়ার ঐতিহ্যে; এরই ধারাবাহিকতায় লুৎফর রহমান রিটন এনেছেন বিস্তার, আমীরুল ইসলাম গভীরতা, অন্যরা বৈচিত্র্য। বুদ্ধদেব বসুর কথায়, ‘শিল্পের কাজ ব্যাখ্যা নয়, অনুভব জাগানো’আজকের ছড়া ঠিক সেই কাজটাই করছে। শিশু এখানে আনন্দ পায়। প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক নিজের সময়কে নতুন করে চিনে নেয়। এই দ্বৈত সংযোগই প্রমাণ করেবাংলা ছড়া আজও জীবন্ত।

লেখক : কবি ও শিশুসাহিত্যিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিশুরাই তো চির প্রবীণ
পরবর্তী নিবন্ধহাঁটু ব্যথার পঞ্চনামা