ছালেহ আহমদ চৌধুরীর শিল্পোদ্যোগ-শিক্ষা বিস্তারে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী | মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ

ছালেহ আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রামের ইতিহাস খ্যাত গৌড়াগত একটি রাজকীয় সৈনিক বংশের অধস্তন পুরুষ। আরাকানি শাসনামলে চক্রশালা রাজ দরবারের সঙ্গে পটিয়া থানার হুলাইন গ্রামের আজিজ খাঁ রোয়াজার পরিবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল। এই পরিবারটির প্রতি রাজার খুব সুদৃষ্টি ছিল। যে কারণে প্রজন্ম পরম্পরায় এই বংশের লোকেরা রাজার অনুগ্রহ লাভ করে এবং রাজকার্য বা শাসনকার্য কিংবা যুদ্ধে যাদের দক্ষতা ও নৈপুণ্য ছিল, তাদেরকে রাজা তাঁর দরবারে বিভিন্ন পদ দিয়ে সম্মানিত করতেন। আজিজ খাঁ রোয়াজাকেও রাজা স্নেহ করতেন এবং তাঁকে রাজদরবারে উজির হিসেবে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজিজ খাঁ রাজদরবারে ওজারতির চেয়ে আঞ্চলিক শাসক হওয়াটাকেই স্নেহতর মনে করেছিলেন। রোয়াজা মানে আঞ্চলিক শাসক বা পল্লী শাসক। আজিজ খাঁ রোয়াজার নয় পুত্রের মধ্যে মুছা খাঁ ছিলেন দ্বিতীয় কিন্তু তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা ও কৃতিত্ব সব ভাইয়ের চেয়ে অধিক পরিগণিত হওয়ায় বংশের নাম আজিজ খাঁর চেয়ে তাঁর পুত্র মুছা খাঁর নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করে। রোয়াজার তৃতীয় পুত্র দরিয়া খাঁ, তিনি নবাবের কাছ থেকে জমিদারি লাভ কেিছলেন। এই দরিয়া খাঁর বংশে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ছালেহ আহমদ চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আমিন শরীফ চৌধুরী, মাতা আমেনা খাতুন। জমিদার বংশে জন্ম হলেও ছালেহ আহমদ চৌধুরীর পিতা আমিন শরীফ চৌধুরীর আমলে পরিবারটির আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে দারিদ্র সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।

ছালেহ আহমদ চৌধুরী অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ কর্মজীবনের অধিকারী ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলের নামজাদা শিল্পপতি, আর শিক্ষা বিস্তারের জন্য কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং স্বীয় সমাজের উন্নয়নের জন্য বহুমুখী কর্মের প্রবর্তন করে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য পুরুষ ছিলেন।

পাঞ্জাবি নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান সরকারের একচোখা নীতির কারণে পাকিস্তানে ২২ পরিবারের একটি মিথ সৃষ্টি হয়েছিলো। পাকিস্তানের ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্প জগত যেন এই ২২ পরিবারের হাতে বন্ধকী সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিলো। এই অবাঙালি প্রভাবাধীন পাকিস্তানের অর্থনীতিতে হঠাৎ ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে পাঁচজন বাঙালির ছেলে অবাঙালি শিল্পপতিদের সাথে পাল্লা দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠার যে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, তা বাঙালির জন্য এক চিরকালীন গৌরবের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই পাঁচজন বাঙালি শিল্পপতি হচ্ছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (আনোয়ারা জুট মিলের প্রতিষ্ঠাতা ও আখতারুজ্জামান বাবুর শ্বশুর), আবুল কাসেম (কাসেম জুট মিলের মালিক), ইউসুফ মিয়া (ইউসুফ টেক্সটাইল ও সুলতানা জুট মিলের মালিক), আবদুল জলিল চৌধুরী (জলিল টেক্সটাইল মিলের মালিক) এবং ছালেহ আহমদ চৌধুরী।

ছালেহ আহমদ চৌধুরীর পর তাঁর ছোট ভাই নূর মোহাম্মদ চৌধুরীও শিল্প প্রতিষ্ঠা করে শিল্পপতি হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। এম আর সিদ্দিকী সাহেবও অন্য দু’জনের সহযোগে এস কে এম জুট মিল নামে একটি শিল্প স্থাপন করেছিলেন, তবে তিনিই ছিলেন মূল উদ্যোক্তা। এম আর সিদ্দিকীর নাম নানা কারণে স্মরণীয়। বাঙালিদের মধ্যে প্রথম ব্যাংক এবং বীমাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।

এম আর সিদ্দিকীর শ্বশুর এ কে খান সাহেব আরো আগের বাঙালি শিল্পপতি; পঞ্চাশের দশকে ইস্পাহানির পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় শিল্প স্থাপন করেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নজু মিয়া সওদাগরের পুত্র ইব্রাহিম মিয়াও (সেকান্দর হোসেন মিয়ার পিতা) সম্ভবত পঞ্চাশের দশকে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

যাই হোক, ছালেহ আহমদ চৌধুরী চরম দারিদ্রকে সঙ্গী করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতার দরিদ্র অবস্থার কারণে ভালো করে লেখাপড়াও শিখতে পারেননি; পিতা যখন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ছোট ছোট তিনটি ভাইকে মানুষ করার দায়িত্ব দিয়ে একটি বৃহৎ পরিবারের বোঝা তাঁর কাধে অর্পণ করে স্বর্গবাসী হলেন, ছালেহ আহমদ চৌধুরী তখন জীবন সমুদ্রে একটি অসহায় ভেলার ন্যায় ভাসছেন। তাঁরও কতইবা বয়স, ঊনিশ বছরের তরুণ তখন। কিন্তু তিনি ছিলেন এমন একজন বীর পুরুষ, যিনি ভাগ্যের হাতে অসহায় আত্মসমর্পণের পাত্র ছিলেন না। নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে তোলার সংকল্প নিয়ে দারিদ্রকে জয় করার সুকঠিন এক সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেন তিনি। তিনি বণিকবৃত্তি অবলম্বন করে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টায় নিয়োজিত করলেন নিজেকে।

তখন বার্মার সাথে একটা ব্যবসা ছিলো। বার্মা থেকে কমলা লেবু, চাউল, সুপারি এসব আসতো। ছালেহ আহমদ চৌধুরী টেকনাফ গিয়ে এই ব্যবসাটাই ধরলেন। ছোট ভাই নুর মুহাম্মদ চৌধুরীকে লেখাপড়ার করার জন্য উৎসাহ জোগালেন। বড় ভাইয়ের প্রেরণায় নুর মুহাম্মদ চৌধুরী একে একে ম্যাট্রিক পাস করলেন, ইন্টারমিডিয়েট পাস করলেন। তারপর ডিগ্রি পড়ার জন্য কানুনগোড়া স্যার আশুতোষ কলেজে ভর্তি হলেন। এ সময় ছালেহ আহমদ চৌধুরী ছোট ভাইকেও ব্যবসা শিখানোর কথা ভাবলেন। ইতিমধ্যে টেকনাফের ব্যবসায় হাতে কিছু পুঁজি সঞ্চিত হওয়ায় তিনি চট্টগ্রাম শহরের ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ আমির মার্কেটে একটি অফিস নিয়ে ট্রেডিং ব্যবসা শুরু করলেন। ছোট ভাই নুর মুহাম্মদ চৌধুরীকেও অফিসে তাঁর পাশে বসিয়ে হাতে কলমে ব্যবসা শিখাতে লাগলেন। আস্তে আস্তে নুর মুহাম্মদ চৌধুরীও ব্যবসার অন্ধিসন্ধি বুঝে গেলেন, পরে নিজেও একটি অফিস নিয়ে আলাদা ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

আইয়ুব খানের ওপেন জেনারেল লাইসেন্স বা ওজিএল লাইসেন্সের ব্যবসা করে দু’ভাইয়ের হাতে বেশ টাকাপয়সা জমলো। ছালেহ আহমদ চৌধুরী এবার ভাবলেন ব্যবসা বাণিজ্য তো অনেক হলো, টাকাপয়সাও কিছু হাতে এসেছে, এখন একটি ইন্ডাস্ট্রি করলে কেমন হয়? এই চিন্তা থেকে তিনি একে একে অনেকগুলো শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেগুলির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছিলো ছালেহ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের। তিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন। ছালেহ গ্রুপের অধীনে ছালেহ কার্পেট, ছালেহ জরিনা স্টীল মিল, ছালেহ জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লি., ছালেহজরিনা রিরোলিং মিলস, ছালেহজরিনা শিপ ব্রেকিং লি. এবং এম ছালেহ আহমদ কোম্পানি। এছাড়া ছালেহ গ্রুপের অধীনে আরো দু’টি মিল ছিলো, সেগুলি হচ্ছে জরিনা গার্মেন্টস এবং জরিনা পেপার মিল। এর মধ্যে পাকিস্তান আমলে একটি বা দু’টি, অন্যগুলি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বিত্তশালী হওয়ার পর ছালেহ আহমদ চৌধুরী এবং তাঁর ভাই নূর মোহাম্মদ চৌধুরী ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে হুলাইন গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে চট্টগ্রাম ু কক্সবাজার সড়কের পাশে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে পশ্চিম পটিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, এমনকি মোহরা এলাকায় পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য কলেজীয় শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেন। এসব এলাকা আগে অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বলে ওঠে। দুই ভাইয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কলেজটির নামকরণ করা হয়-“হুলাইন ছালেহনূর কলেজ।” ছালেহ আহমদ চৌধুরী তাঁর পিতার নামে পাহাড় খাঁর দীঘির পাড়ের পুরোনো স্কুলটির উন্নয়ন সাধন করেন। তাছাড়া একটি এতিমখানা, ইয়াছিন আউলিয়া আবেদিয়াহামিদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, জরিনা বেগম কারিগরি বিদ্যালয়সহ আরো নানা সমাজমঙ্গলকর্মের ধারা দু’ভাই হুলাইনকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। ছালেহ আহমদ চৌধুরীর আরও দু’ভাই ছিলেন। তাঁরা হচ্ছেনজালাল আহমদ চৌধুরী ও ফয়েজ আহমদ চৌধুরী।

ছালেহ আহমদ চৌধুরী অত্যন্ত সৃশৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন, নিয়মের নিগড়ে বাঁধা ছিল তাঁর জীবন। পরিমিত আহার করতেন; রাশভারি মানুষ; হালকা, চটুল কথাবার্তা বলতেন না। শহরে যতক্ষণ থাকতেন, ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ধর্মভীরু মানুষ, রোজা নামাজ কখনও কাজা করতেন না। কুতুবদিয়ার মালেক শাহর মুরিদ হয়েছিলেন। মালেক শাহর দরবারে গিয়েই তাঁর মুর্শিদের সান্নিধ্যে আল্লাহর নাম জপতে জপতে ইহজগত থেকে বিদায় নেন।

ছালেহ আহমদ চৌধুরী দু’বার দার পরিগ্রহ করেন। পটিয়া থানার আশিয়া গ্রাম থেকে তিনি প্রথম বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সহধর্মিণীর নাম জরিনা বেগম। প্রথম স্ত্রীর ঘরে ছালেহ আহমদ চৌধুরী দু’পুত্র ও চার কন্যা সন্তান লাভ করেন। পুত্রদ্বয়ের নাম রেজাউল করিম চৌধুরী ও শাহনেওয়াজ চৌধুরী মন্টু।

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ছালেহ আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রাম শহরের মাদারবাড়ির একটি শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম জাহানারা বেগম। তাঁর গর্ভে ছালেহ আহমদ চৌধুরী একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র সন্তানের নাম ছালেহ রবিউল করিম চৌধুরী। সে একজন ফ্যাশন ডিজাইনার।

ছালেহ আহমদ চৌধুরীর চার কন্যা হচ্ছেন জাহানারা ইসলাম, দিলারা হোসেন, রওশন মোখতার, শামীম আরা আহমদ। ছালেহ আহমদ চৌধুরী ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ কুতুবদিয়ায় মালেক শাহ দরবারে ৫৮ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতি সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশের ইস্পাত শিল্পে চট্টগ্রামের অনন্য অবদান
পরবর্তী নিবন্ধঅশোভন মন্তব্যে সৌদি যুবরাজ এমবিএসকে উপহাস ট্রাম্পের