লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সংলগ্ন এলাকায় ছড়ায় কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে রাখা হয়েছে। এর ফলে একাধিক স্থানে পাহাড়ি টিলা ধসে পড়ছে। যা এলাকাটির প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। এতে শুধু টিলার স্থিতিশীলতাই নষ্ট হচ্ছে না। বরং অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চুনতি ও আধুনগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সন্নিহিত গোলাইম্যা ঘোনা এলাকার কুলপাগলীর ছড়ায় অবৈধভাবে মাটি দিয়ে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এই বাঁধের কারণে ছড়ার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি জমে থাকায় পাশের পাহাড়ি টিলায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল অবৈধভাবে ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধ দিয়ে পানি জমিয়ে রেখেছে। তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। এর ফলে পাহাড়ি টিলা ধসে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, আগে ছড়ার পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হয়ে আশপাশের জমিতে সেচের সুবিধা দিত। কিন্তু কৃত্রিম বাঁধের কারণে পানি একটি নির্দিষ্ট স্থানে আটকে থাকছে। ফলে নিচের দিকে থাকা কৃষিজমিতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে কৃষকরা তাদের ন্যায্য পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত গোলাইম্যা ঘোনা এলাকায় কুলপাগলির ছড়ায় কৃত্রিমভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে রাখা হয়েছে। এতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জমে থাকা পানির চাপ ও মাটির দুর্বলতার কারণে পাশের পাহাড়ি টিলার একাধিকস্থানে ধস দেখা দিয়েছে। টিলার মাটি ধসের ফলে গাছপালাও উপড়ে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, ছড়ায় কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ শুধু পাহাড়ি টিলার জন্যই নয়, বরং পুরো চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অভয়ারণ্যের ভেতরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বাঁধের নিচের দিকে পানি না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিটের বিট কর্মকর্তা চঞ্চল কুমার তরফদার জানান, কৃত্রিম বাঁধের কারণে পাহাড়ি টিলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা দেখার জন্য বনবিভাগের লোকজনকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হবে। পরে তদন্ত পূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুর জাহান জানান, এভাবে চলতে থাকলে ছড়ার পাশে একটি টিলাও রক্ষা করা যাবে না। ঘটনাস্থলে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তাকে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম জানান, প্রাকৃতিক ছড়ায় বাঁধ দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। এতে অল্প কিছু কৃষক উপকৃত হলেও এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষ করে বাঁধের ভাটির দিকে থাকা কৃষিজমিতে উচ্ছ ফলনশীল ফসল চাষ করা হয়েছে। যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। ছড়ার পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে এসব জমিতে পানির সংকট দেখা দিবে। ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কৃষি উৎপাদনে বড় ধরণের ক্ষতির আশংকা রয়েছে।














