যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের বর্ণনায় বলছেন, এই যুদ্ধ জেতা হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। আবার বলছেন, এটি এক ছোট্ট অভিযান (এসকারশন), যার জন্য ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ প্রয়োজন।
ট্রাম্পের এই ধরনের জটিল বা পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা তার যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য নিয়ন্ত্রণের রীতির সঙ্গে খাপ খেয়ে গেলেও যুদ্ধের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। যুদ্ধের জয়–পরাজয় কোনো খেলার স্কোরবোর্ডের মতো নয়। আগে থেকে নির্ধারণ করা সময়ের পর খেলার স্কোরের মতো যুদ্ধে কোনো স্কোর জয়ের ঘোষণা দেয় না। খবর বিডিনিউজের।
ইরানে হামলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যে বীরত্বগাথা বা গেমিং–স্টাইলের ভিডিও প্রচার করছে, তার পেছনে আছে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এই মূহূর্তের এক কঠিন বাস্তবতা। যেখানে আমেরিকানদের জন্য কেবল আমরা জিতেছি বললেই হয় না, বরং ইরান যেন সত্যিই পরাজিত হওয়ার মতো আচরণ করে সে অবস্থায় আনতে আমেরিকানদের কতদূর যেতে হবে, প্রশ্ন সেটি।
ট্রাম্প এখন আধুনিক যুদ্ধের সেই পুরনো ফাঁদে আটকা পড়েছেন, যেখানে মনে করা হয় একটি দ্রুত ও সার্জিক্যাল সামরিক অভিযান স্থায়ী রাজনৈতিক ফলাফল দেবে। যেমনটি সোভিয়েতরা আফগানিস্তানে, যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে ইরাকে করেছিল এবং পুতিন ইউক্রেনে করেছেন এবং এখনো লড়ছেন। কোনো সামরিক শক্তি শুরুর দিকে যতই সফল হোক না কেন, আক্রান্ত মানুষের নিজের ভূমি ও ঘর রক্ষায় জেদ সবসময়ই বেশি থাকে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের উপর ভিত্তি করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার সুযোগ নিতে হোয়াইট হাউজ হয়তো তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ভিন্ন; তিনি চান ইরান ধসে পড়ুক, যেন তারা আর হুমকি না থাকে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু সমস্যার সমাধানের চেয়ে সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে বেশি।
ভেনেজুয়েলায় প্রেনিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে হঠানোর সময় তার স্থলাভিষিক্ত করতে ট্রাম্পের জন্য ডেলসি রদ্রিগেজের মতো কোনো বিকল্প নেতা ছিল, কিন্তু ইরানের তেমনটি নেই। উল্টো ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা দ্রুত পূরণ করেছে কট্টরপন্থিরা। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন, যাকে ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই ক্ষমতায় দেখতে চাননি।
মুজতাবা ভিডিও বার্তা দেওয়ার মতো সুস্থ কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার প্রথম বার্তা পড়ে শোনানো হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের কমান্ডারদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সচেষ্ট হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক নেতারা যদি একইভাবে নিহত হতেন, তাহলে যেমন প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি হতো, ইরানেরও এখন ঠিক তেমনই তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই ক্ষোভই ট্রাম্পের জন্য দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলেছে।
মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে ইরান এই যুদ্ধকে এক ধরনের ধৈর্যের পরীক্ষায় পরিণত করেছে, এবং এখন পর্যন্ত তারা তা সহ্য করে টিকে আছে বলেই মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে মাসের পর মাস বোমা হামলা চালাতে পারে। কিন্তু তাতে তাদের মূল্যবান গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাছাড়া আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ বাড়া এবং মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি তো রয়েছেই।
আইআরজিসির নেতারা বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাদের কাছে এটি কেবল যুদ্ধ নয়, এক ধরনের আদর্শিক দায়িত্ব। তাদের বোমা বা মানুষ ফুরিয়ে গেলেও অনুপ্রেরণা ফুরাবে না, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে পাওয়া শিক্ষা এটাই। ইরানের অভ্যন্তরে সরকারকে সমর্থন করা নিয়ে বিভক্তি আছে। কিন্তু যখন কোনো দেশ বিমান থেকে বোমা হামলার শিকার হয়, তখন অনেক সময় ভিন্নমতের মানুষও একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। ধারণা করা হয়েছিল যে, ধারাবাহিক নিখুঁত বিমান হামলায় ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা গেছে যে, এই ধারণা বাস্তবসম্মত ছিল না। উল্টো বোমা হামলা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকেও এক করে দিচ্ছে। এখন ট্রাম্পের কাছে ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য অনেকটাই বদলে গেছে। তিনি এখন যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজছেন।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক ক্ষমতা কমানো বা কিছু শীর্ষ নেতাকে সরানো সম্ভব হলেও এখন পর্যন্ত তা দেশটির সরকারকে নীতি বদলাতে বাধ্য করতে পারেনি এবং সরকার পরিবর্তনও ঘটাতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব হামলার কার্যকারিতা কমতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। কারণ লক্ষ্যবস্তু কমতে থাকলে সেগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর সঙ্গে এক হয়ে যাবে। অন্যদিকে, ইরানের জন্য ঝুঁকি আর পুরস্কারের হিসাবটা ভিন্নভাবে কাজ করছে। তারা চাইলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বা আক্রমণ করে তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে রাখতে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে। তখন অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে বলতে পারে, ট্রাম্পের উচিত ছিল আগেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটি বোঝা।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়তো কমে যেতে পারে, কিন্তু কেবল এই হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাই তাদের জন্য এক ধরনের জয়। ওদিকে, ট্রাম্প এখন প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ শেষ করা ও জয়ের কথা বলছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি যুদ্ধ শেষ করতে চান। কিন্তু যুদ্ধের সময় বার্তার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বারবার যুদ্ধ শেষের কথা বলায় প্রতিপক্ষ বুঝে যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যেতে চাইছে। ফলে ইরানের শাসকদের জন্য পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্পষ্ট। তাদের জন্য এখন জয় মানে পুরোপুরি জেতা নয়, কিন্তু অন্তত পরাজিত না হওয়া। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ হল কেবল টিকে থাকা।










