ভাদ্র মাস এলেই চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে মধুভাত রান্নার ধূম পড়ে যায়। সেই সাথে চলে তালের পিঠা,বানানোর মহোৎসবও। ভাদ্রের প্রখর গরমে গাছে গাছে তাল পাকতে শুরু করে। আর গাছ পাকা তাল, সেতো অন্য রকম এক ঘ্রাণে ভরা। মধুমাখা যেনো সেই সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে এলাকা জুড়ে। সেই কবিতা, তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে / উঁকি মারে আকাশে….”। ছোটবেলায় সেই মন মাতানো সুগন্ধ বেরুলেই বুঝতাম তাল পেকেছে। আর কিছুক্ষণ পর পর ধুম ধুম করে পাকা তাল গাছ থেকে পড়তো, আর আমরা কার আগে কে নেবো সেই প্রতিযোগিতায় নামতাম। তালের পিঠার সাথে মধুভাতের এক অদৃশ্য সম্পর্ক কেবল চট্টগ্রামেই বিদ্যমান। চাঁটগাইয়া রসম এ মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে তাল পিঠা আর মধুভাত দেয়ার নিয়ম অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। আমরা দেখেছি সারা রাত ধরে বাড়ির বউ, ঝি, গৃহিণীরা মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে পাঠানোর জন্য তাল পিঠা আর মধুভাত বানানোর উৎসবে মেতে উঠতেন। এই রেওয়াজ ধনী গরীব নির্বিশেষে দেখেছি। এই দুটি আইটেম বানানোর কৌশলই আলাদা। ঘরে ঘরে ঠিকই তৈরি করে, কিন্তু সবার হাতে এটি সঠিকভাবে হয় না। স্বাদে ভিন্নতা হয় বলেই অনেকেই (বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাইরের মানুষ) এটি খেতে চায় না। সুপ্রিয় পাঠক, আজ মধু ভাতের চাল তৈরীর ইতিবৃত্ত এবং সেটি রান্নার কৌশলের অজানা গল্প শোনাবো।
মধুভাত রান্নার প্রধান উপকরণ জ্বালা চাল। আর জ্বালা মানে হলো ধানের বীজ। যে বীজ থেকে ধানের চারা রোপণ করা হয়। তো চারা রেডি করতে প্রথমে বীজ ধান রেডি করতে হয়। কৃষকের চেয়ে এই কাজ কিষাণীরাই করে থাকেন। উনারা প্রথমে শুকনো ধানকে ধুয়ে বড় বড় টুকরি নিয়ে পুকুরে ভিজিয়ে রাখেন। সেখানে কয়েক দিনেই ধানে শেকড় গজায়। এর পর সেগুলো পানি থেকে তুলে জমিকে চষে পানি দিয়ে ভিজিয়ে জ্বালা বিচানা তৈরি করা হয়। বীজ রোপার জমিও কিন্তু আলাদা। সব জমিতে বীজ ফেলা যায় না। এই বীজ আষাঢ় শ্রাবণ মাসে তৈরি করতে হয়। বীজ এর জমিও তৈরি করা থাকে। সেই জমিতেই চাষী বীজ ধান ফেলবে। কয়েক দিনেই সেগুলো চারায় পরিণত হয়ে যায়। এই চারাকে বলে চট্টগ্রামের ভাষায় ‘রোয়া’ এর পর চারা (রোয়া) কেই ধান চারা রোপণের উপযুক্ত জমি চষে (রোয়া রুকে) ধানের চারা কৃষকেরা সারিবদ্ধ করেই রোপণ করে। বিস্তীর্ণ জমি তখন সবুজে সবুজে ভরে যায়। এক সময় থোড় আসে মানে কচি ধান। এর পর আস্তে আস্তে পাকতে শুরু করে। সবুজ ভূমি সোনালী রঙ্গে ভরে ওঠে। নতুন ফসল ঘরে তুলতে দিন গুণে কিষাণী। মেতে উঠে নবান্ন উৎসবে। মধুভাতের কাহিনী লিখতেই খানিকটা জ্বালা ধান থেকে বীজ চারা আর পাকা ধানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলাম। এখন ফিরে আসি মধুভাতের কাহিনীতে। সেই যে ধানের বীজের জন্য জ্বালা ধান তৈরি করে, সেই বীজ ধানকে শেকড়সহ রোদে শুকিয়ে, ঢেকিতে ছেঁটে গুড়া, করেই, চেলে ঝেড়ে যে চাল পাবে, সেটিই হলো মধুভাতের প্রধান উপকরণ। সেটি কিন্তু অনেক কষ্টের কাজ। কিন্তু মধুভাত রান্না বেশী কষ্টের কাজ না। তবে সঠিক প্রসেসিং জানতে হবে। তবেই সত্যিকারের মধুভাতে মধুর স্বাদ পাওয়া যাবে। যেহেতু এই খাবারটি কেবল চট্টগ্রামের মানুষরাই করে এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। আমি ছোটবেলা থেকে এসব দেখেই বড় হয়েছি। নানীর বাড়ি দাদীর বাড়িতে ঘরে ঘরে রান্না হতো। আর ভোরেই দাওয়াত আসতো কোন না কোন ঘর থেকে। বাটি পেয়ালা না, ভাতের থালাতেই পরিবেশন করা হতো। ঘন কুচি কুচি নারকেল দিয়ে এই ভাত খেতে কি যে স্বাদ, আর আনন্দ পেতাম। এখন কালের পরিবর্তন হয়েছে, সেইদিন আর নেই। গ্রামের গৃহিণীরাও আক্রান্ত ভোগবিলাস আর ডিজিটাল রোগে। হাতে হাতে মোবাইল। সারা দিন ফোনেই থাকে। ঢেঁকিও নেই। কিষাণীও নেই। সবাই অন্যভাবে সময় পার করছে। কেহ কারো কাজে সাহায্য করবে না। পারিশ্রমিক দিলেও করবে না। ফলে মধুভাত রান্না তো দূরের কথা জ্বালা চাল তৈরি করারও মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পিউর জ্বালা চাল মেলানো কঠিন হয়ে গেছে। আমাদের পাশের বাড়ির জমিলার কাছ থেকে তার নিজের হাতের রেডি করা জ্বালা চাল কিনতে গিয়েই শুনলাম এখন এই চাল তৈরির আকাল পড়েছে। কষ্টের কাজ বলে কেউ করতেই চায় না। ফলে চাল এখন বেশী পাওয়া যায় না। এর পরেও আমাদের মতো কিছু গৃহস্থ ঘরে আমরা জ্বালা চাল তৈরি করি এখনো। এখন মধু ভাতের রেসিপিটি বলি। এককেজি পোলাও এর চাল, এক পোয়া থেকেও কম জ্বালা চালের গুড়া। পোলাও চাল এর ভাত রান্না করে ঘুটে নরম করে ফেলতে হবে। এরপর আরেকটা শুকনো পাতিলে প্রথমে কিছু জ্বালা চালের গুড়া ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর ঘুটা ভাত (অনেকটা ঘন থকথকে) সেই পাতিলে গরম গরম ঢেলে চিনি মেশাতে হবে স্বাদমতো। কেউ কেউ একটু তরল দুধ দিয়ে থাকেন। এরপর আবার জ্বালা চালের গুড়া ভাতের উপর ছিটিয়ে দিতে হবে। ব্যাস। এবার পাতিলে ঢাকনা দিয়ে পাতলা কম্বল আর বিছানার চাদর দিয়ে গাট্টি বেঁধে রেখে দিতে হবে সারা রাত সকালে দেখবেন কি সুন্দর এবং সুস্বাদু মধুভাত রেডি। কেউ কেউ একটু বিনি চাল দেন। এতে ঝিমুনি আসে খেলে। স্বাদও পরিবর্তন হয়ে যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেনো টক হয়ে না যায়। এবার পছন্দ মতো নারকেল কুচি দিয়ে পরিবেশন করুন। দেখবেন কি দারুণ লাগে খেতে।