নির্বাচন কমিশনের কঠোর আচরণবিধির কারণে মাঠে পুরোপুরি ভোটের আমেজ না এলেও চট্টগ্রামের প্রতিটি আসনে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে ভোটের হিসাব মেলানো শুরু হয়ে গেছে। দোয়া মাহফিল, কর্মী সভা, উঠান বৈঠক, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচির আড়ালে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সুন্নি জোটসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা রয়েছেন চট্টগ্রামের নির্বাচনী মাঠে।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে প্রায় প্রতিটি আসনেই আসনে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে বিএনপি। এরমধ্যে বেশ কিছু আসনে জামায়াতে ইসলামীরও শক্ত অবস্থান রয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার পর চট্টগ্রামে ভোটের মাঠের সমীকরণ অনেকটা পাল্টে গেছে। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতায় চট্টগ্রামে ১৬ আসনের মধ্যে ৯ আসন জামায়াতে ইসলামী নিজেদের জন্য রেখে ছয় আসন ছেড়ে দিয়েছে জোটের অপর ৫ শরিক দলকে। অপরদিকে চট্টগ্রাম–১১ বন্দর–পতেঙ্গা আসনটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।
১১ দলীয় জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে নয়টি আসনে নিজেদের জন্য রেখেছে ; এসব আসন হলো– চট্টগ্রাম–১ (মীরসরাই), চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড ও আকবরশাহ), চট্টগ্রাম–৬ (রাউজান), চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া), চট্টগ্রাম–১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী ও হালিশহর), চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া) এবং চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী)।
জামায়াতে ইসলামী যে নয়টি আসন নিজেদের জন্য রেখেছেন তার মধ্যে ৮টি আসনে বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর সাথে বিএনপির দলীয় প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থীর ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা বলছেন স্থানীয়রা।
এদিকে চট্টগ্রাম–১১ বন্দর–পতেঙ্গা আসনটি জোটগতভাবে জামায়াত না নিলেও এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হচ্ছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলমের সঙ্গে।
চট্টগ্রাম–১ (মীরসরাই) আসনে মূলত বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিনের সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই আসনের জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমানের। এদিকে চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস রয়েছে। চট্টগ্রাম–৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীনের। চট্টগ্রাম–৪ সীতাকুণ্ড আসনেও বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিকের। এদিকে চট্টগ্রাম–৬ রাউজান আসনে বিএনপির গোলাম আকবর খোন্দকার, বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত যিনিই দলীয় প্রতীকসহ চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান মঞ্জুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এদিকে চট্টগ্রাম–৭ রাঙ্গুনিয়া আসনে বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরীর সঙ্গে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিমের।
আর চট্টগ্রাম–১০ ডবলমুরিং–হালিশহর–পাহাড়তলী আসনে বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে আভাস পাওয়া গেছে।
এদিকে চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক বিরোধী দলীয় হুইপ শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন এই আসনের সচেতন ভোটাররা।
এদিকে চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপি, জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী ও স্বতন্ত্র মোহাম্মদ লেয়াকত আলী এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ জহিরুল ইসলামের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন এলাকাবাসী।
১১ দলীয় জোটে চট্টগ্রামে অপর ৫ শরিক দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম–৮ (বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও) আসনে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসনে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) ও চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ) আসনে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম–৯ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় সেখানে নেজামে ইসলাম পার্টিকে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং খেলাফত মজলিস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনে।
চট্টগ্রাম–৮ (বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসান আরিফের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে বলে জানিয়েছেন এই আসনের ভোটারেরা।
এদিকে চট্টগ্রাম–৯ কোতোয়ালী আসনে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী মো. নেজাম উদ্দীন। এখানে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তৃণমূল পর্যায়ে তার জনসমর্থন ঈর্ষনীয়।
চট্টগ্রাম–১২ পটিয়া আসনটি জোটগত ভাবে এলডিপিকে দেয়া হলেও এই আসনে এলডিপির প্রার্থী এম. এয়াকুব আলীর মনোনয়ন ঋণ খেলাপির কারণে বাতিল হয়েছে। এই আসনে বিএনপির মোহাম্মদ এনামুল হক ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের মাঠ পর্যায়ে বেশ শক্ত অবস্থান রয়েছে। জোটগত ভাবে আসনটি এলডিপিকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে থাকবেন কিনা তা আগামী ২০জানুয়ারি জানা যাবে।
এদিকে ১১ দলীয় জোট থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসনটি। এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. নাসির উদ্দীন। এই আসনে শক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যরিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনটি খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দিয়েছে ১১ দলীয় জোট। এই আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ ইমরান। তবে এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তিনবারের সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজাম। আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন থেকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে হারিয়ে এবং ২০০১ সালে আতাউর রহমান খান কায়সারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
দক্ষিণের ২ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস : দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৫ সংসদীয় আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ) আসনে দীর্ঘদিন থেকে এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের শক্ত অবস্থান থাকলেও এবার তিনি নিজে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তাঁর ছেলে ওমর ফারুককে এলডিপি থেকে নির্বাচনী মাঠে নামিয়েছেন। এই আসনে এবার বিএনপি থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন আহমেদকে। যিনি স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন। উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। সরকার পতনের পর এক বছরের মাথায় উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিদায় নিতে হয়। যার কারণে তাঁরও মাঠের অবস্থান ভালো। এদিকে এই আসনে (চট্টগ্রাম–১৪ চন্দনাইশ) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গত ১৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি মো. মিজানুল হক চৌধুরী। এলাকায় তার অবস্থানও ভালো। যার ফলে এই আসনে বিএনপি, এলডিপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর (বিএনপির বিদ্রোহী) ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন অভিজ্ঞ মহল।
চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপি, জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ভোটাররা।
এ আসনটি এবার দক্ষিণ চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে মাঠে লড়ছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর পুত্র মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। এ আসনে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে নেমেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী। মনোনয়ন নেয়ার আগে তিনি নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণে বড় ধরনের শোডাউনও করেছেন। মিশকাতুল ইসলামের পিতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী একাধিকবার এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হলেও এবার দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ধানের শীষের প্রার্থী (মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী) কিছুটা বেকায়দায় রয়েছেন। তবে এই আসনে জামায়াত ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। বিএনপির দলীয় প্রার্থীর সাথে স্বতন্ত্র হিসেবে বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। আসন্ন নির্বাচনে তিন প্রার্থীই সমানতালে লড়ছেন এবং তাদের মধ্যে জোরালো লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্থানীয় ভোটাররা জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি। প্রচারণা শুরু হবে আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে। ভোটগ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। একই দিনে বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭জন এবং মহিলা ভোটার সংখ্যা ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০জন। এবার তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭০জন।











