ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিবছর দেশে দুটি বৃহৎ বইমেলা হয়; ঢাকা ও চট্টগ্রামে। যা অমর একুশে বইমেলা নামে পরিচিত। গত বছর (২০২৫) ঢাকার সাথে মিল রেখে চট্টগ্রামেও ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ায় এ বছর ঢাকায় নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে আজ শুরু হচ্ছে মেলা। কিন্তু চট্টগ্রামে এ বছর হচ্ছে না একুশের বইমেলা। বইমেলার আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) দায়িত্বশীলরা বলছেন, রমজান মাস হওয়ায় প্রকাশকরা বইমেলা আয়োজন নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। এরপরও প্রকাশকরা আগ্রহী হলে ঈদের পরে বইমেলা আয়োজন করবে চসিক।
এদিকে চট্টগ্রামের প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সংগঠন চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, ঈদের পর এপ্রিল মাসে বইমেলা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। রমজান মাস হওয়ায় ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আয়োজন করার বিপক্ষে বেশিরভাগ প্রকাশক। প্রকাশকদের ধারণা, রমজানে বইমেলার আয়োজন করলে পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি কম থাকবে, হবে না প্রত্যাশিত বিকিকিনিও। এতে আর্থিকভাবে লোকসান হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
তবে প্রকাশকদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পাঠক ও লেখকরা বলছেন, এ মাসে যে বইমেলা আয়োজন করা হয় তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একুশ। অন্যমাসে আয়োজন করলে সেটা আর একুশের বইমেলা হবে না। প্রকাশকরা সারা বছর কমবেশি ব্যবসা করে থাকেন। এ বছর কিছুটা কম লাভ হলেও ধারাবাহিকতা রক্ষায় ভাষার মাসেই বইমেলার আয়োজন করা উচিত ছিল।
এ বিষয়ে কথাসাহিত্যিক জাহেদ মোতালেব আজাদীকে বলেন, এ বইমেলা শুধু বইমেলা না, এটা হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা। এর সাথে জড়িত আছে একুশ। একুশ তো বাংলাভাষা এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বের শেকড়। ওখান থেকেই সবকিছুর ডালপালা ছড়িয়েছে। সময় পাল্টাবে, অনেক কিছু ঘটবে, কিন্তু একুশের বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই হওয়া উচিত। অন্য মাসে হলে বইমেলা হবে, কিন্তু একুশ থাকবে না। একুশ বা ফাল্গুনের ঘ্রাণ, শোক–তাপ, ভাষা শহীদদের প্রতি ভালোবাসা, ভাষার প্রতি ভালোবাসা ফেব্রুয়ারি ছাড়া অন্য মাসে হবে না। প্রতিবারের মতো ঢাকার সাথে মিল রেখে ফেব্রুয়ারিতেই চট্টগ্রামে বইমেলা হওয়া দরকার ছিল।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীন হাসান বাবু আজাদীকে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে জনসমাগম হয় এমন আয়োজনে বিধিনিষেধ ছিল। তাছাড়া নির্বাচনকে ঘিরেও নানা শঙ্কা ছিল। সবমিলিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরু করার মত অবস্থা ছিল না।
নির্বাচন শেষে বইমেলা আয়োজনের কোনো উদ্যোগ না নেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, নির্বাচনের পর তো রমজান এসে গেছে। রোজার মাসে হাতেগোনা কয়েকজন প্রকাশক ছাড়া বেশিরভাগই বইমেলা করার বিপক্ষে। কারণ বইমেলা শুরু হয় বিকেলে, আবার আসরের পর থেকে ইফতারের প্রস্তুতি শুরু হয়, এরপর তারাবির নামাজ। ফলে বইমেলা আয়োজন করলেও পাঠকের উপস্থিতি ও বেচাকেনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে প্রকাশকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। সবকিছু বিবেচনা করে বেশিরভাগ প্রকাশক রমজানে বইমেলা করার বিপক্ষে। ‘তাহলে চট্টগ্রামে কি এবার বইমেলা হবে না’? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের পরিকল্পনা আছে এপ্রিলে করার। এ বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে মেয়র এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীলদের সাথে কথা হয়েছে।
এ বছর বইমেলা আয়োজন না করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, প্রকাশকরা আগ্রহ দেখায়নি। হয়তো তারা মনে করেছে রমজানে বইমেলা হলে বেচাকেনা কম, ব্যবসায়িক জায়গা থেকে সাফল্য আসবে না। এখন প্রকাশকরা অংশ না নিলে বইমেলা হবে কিভাবে। তারা যদি আগ্রহ দেখাত আমরা আয়োজন করতাম। প্রকাশকরা যদি এগিয়ে আসে ঈদের পর মার্চ মাসে স্বাধীনতার বইমেলা নামে বইমেলা করতে পারি।
জানা গেছে, পূর্বে ফেব্রুয়ারি মাসে নগরে পৃথক তিনটি বইমেলা আয়োজন করতো বিভিন্ন সংস্থা এবং সংগঠন। এতে পাঠক ও দর্শনার্থীরা বিভ্রান্ত হতেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে জিমনেশিয়াম মাঠে বইমেলা আয়োজন করে চসিক। তবে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, নাগরিক সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প–সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাই সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করে। ফলে অভিন্ন এ বইমেলা সমাদৃত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর জিমনেশিয়াম মাঠে বইমেলা হয়ে আসছে। মাঝখানে ২০২১ সালে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বইমেলা আয়োজন করা হয়নি।











