বাংলা পুঁথির সূত্রপাত হয় ১৪–১৫ শতকে। পুঁথিগুলো সাধারণত ছন্দে হতো, গান–গল্পের নীরিখে পাঠ করা হতো। প্রাচীন বা মধ্যযুগের প্রায় সকল সাহিত্য হাতে লিখতে হয়েছিল এবং এদের একাধিক সংস্করণও তৈরি হয়েছিল হাতে লিখে। তাই প্রাচীন ও মধ্যযুগের সকল সাহিত্যকেই পুঁথিসাহিত্য বলা হয়।
প্রধান প্রধান কয়েকটি পুঁথির ধারার মধ্যে অন্যতম বৈষ্ণব পুঁথি; কৃষ্ণলীলা, রাধাকৃষ্ণ উপাখ্যান, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভাবধারা নিয়ে অসংখ্য পুঁথি রচিত হয়। মঙ্গলকাব্যধর্মী পুঁথি; মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ইত্যাদি কাহিনি লোকরীতি অনুসারে পুঁথি আকারেও প্রচলিত ছিল। প্রেমাষপদ ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী পুঁথির মধ্যে ছিল– লায়লি–মজনু, সাইফুলমুলক–বদিউজ্জামাল, আমির হামজা এসব কাহিনি জনজীবনে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ইসলামি–সুফি পুঁথি; ইউসুফ–জুলেখা, নবীবংশ, গাজীর গান, মহব্বতনামা। এগুলোই বাংলার পুঁথি সাহিত্যের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যময় অংশ ছিল। এসবে ফুঁটে উঠে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, প্রেম ও মানবতাবোধ। বিশেষকরে বাঙালি মুসলমান কবি–মনীষীদের অবদান বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়–এদের রচনা সাধারণ মানুষের গহীনের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।
তৎকালীন সময়ে সন্ধ্যায় গ্রামের উঠানে বা বটগাছ তলায় হারিকেন বা মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে জোয়ান–বুড়ো সকলেই মিলে পুঁথি শুনতো। গ্রামীণ সমাজে দলবেঁধে পুঁথি শুনা ছিল মোহনীয় বিনোদন ও ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম মাধ্যমস্বরূপ। এখন নগর সংস্কৃতিতে পুঁথি পাঠ শোনার সুযোগ একেবারেই বন্ধপ্রায়। অন্যদিকে কোনো কোনো গ্রামে যৎসামান্য পুঁথি পাঠ শোনা গেলেও তা চট্টগ্রামে বিলুপ্তপ্রায়। প্রাচীন সব পুঁথি এখন হয় জাদুঘরে নতুবা ব্যক্তিগত সংগ্রহে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির দুষপ্রাপ্য শাখায় রয়েছে পুঁথির দুর্লভ সংগ্রহ। সেখানে রয়েছে তুলট কাগজ, তালপাতা ও বাঁশখণ্ডের উপর বাংলা, সংস্কৃতি পালি, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় লেখা ৫৬৫টি পান্ডুলিপি। শুধু কি পুঁথি! বাংলাদেশের অন্যতম এই গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ দুষপ্রাপ্য পান্ডুলিপিতে। গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ এই গ্রন্থাগারকে মহিমান্বিত করে রেখেছে। গ্রন্থাগারের দুষপ্রাপ্য শাখায় এমন দুর্লভ পান্ডুলিপি রয়েছে যা দেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নেই। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে গড়ে উঠা গ্রন্থাগারটি ক্রমেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানে পরিণত হয়েছে।
গ্রন্থাগারে দেশি–বিদেশি বই ও জার্নাল রয়েছে প্রায় ২ লাখ। গবেষকদের গবেষণা কর্মের উপাত্ত হিসেবে চিহ্নিত প্রাচীন পান্ডুলিপি, দুর্লভ বই, দলিল, সাময়িকীসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত নানা প্রকাশনা। আড়াইশ থেকে একশ বছরের মধ্যে অনুলিখিত পান্ডুলিপি রয়েছে এই গ্রন্থাগারে। যার সংগৃহীত পুঁথি, পুস্তক ও পান্ডুলিপি নিয়েই প্রথম যাত্রা দুষপ্রাপ্য শাখার তিনি হলেন পুঁথি সংগ্রাহক আব্দুস সাত্তার চৌধুরী। সংগ্রহশালাটি সমৃদ্ধ হয়েছে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ক্ষেমেশ চন্দ্র রক্ষিত, নজরুল ইসলাম, ড. রশীদ আল ফারুকী ও ড. আব্দুল গফুর প্রদত্ত সংগ্রহ থেকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুর্লভ সংগ্রহে বাঙালির বহু অনাবিষ্কৃত উপাদান লুকায়িত রয়েছে। নতুন প্রজন্মের গবেষকদের পুঁথিবিষয়ক গবেষণায় উৎসাহিত করলে অনেক অজানা বিষয় উদ্ধার হবে। সারাদেশ তথা চট্টগ্রামে প্রায় হারাতে বসা পুঁথি সাহিত্য পুন:জাগরণ হলে বর্তমান প্রজন্ম বাংলার লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, মধ্যযুগীয় বাংলার মানুষের চিন্তা, রুচি নৈতিকতা সম্পর্কে ধারণা দিবে তাই পুঁথি সাহিত্যের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।












