বাংলাদেশে অসচেতনতাই হৃদরোগে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ। বুকে ব্যথা বা শারীরিক অস্বস্তি হলে অনেক সময় আমরা সেটিকে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে করে অবহেলা করি। অ্যান্টাসিড বা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে ঘরে বসে থাকি বা সময় নষ্ট করি। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রতিটি সেকেন্ড খুব মূল্যবান, ফলে সময় নষ্ট করা চরম বোকামি ও বিপজ্জনক। আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে হাসপাতালে পৌঁছে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হৃদযন্ত্রের রক্তনালি বন্ধ হয়ে হৃৎপেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে, বাড়তে পারে হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি। এর পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান ও মদ্যপানসহ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং তরুণদের জীবনযাপনে পরিবর্তন হৃদরোগের বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা হঠাৎ অজ্ঞান, বুকের মাঝখানে চাপ, জ্বালা–পোড়া বা ভারী অনুভূতির পাশাপাশি হাত বা থুতনিতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, অতিরিক্ত ঘাম ও বমি বমি ভাব হার্ট অ্যাটাকের পরিচিত লক্ষণ। তবে নারী, প্রবীণ ও ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা ছাড়াও হাতে ঝিমঝিম, মাথা হালকা লাগা, সামান্য অস্বস্তি বা হঠাৎ ঘামের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভেতে দেখা যায়, হার্টের সমস্যা আছে সারা দেশে এমন রোগীর সংখ্যা গড়ে প্রতি হাজারে ৩১ জনের বেশি। চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে এই হার প্রতি হাজারে ৩৪ থেকে ৩৬ জন। অর্থাৎ জাতীয় গড়ের চেয়ে চট্টগ্রাম ও বরিশালে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। ঢাকা ও রংপুরে এ রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক কম, গড়ে হাজারে ২৪ থেকে ২৬ জন।
সারাদেশে যখন হৃদরোগের এই অবস্থা তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সার্জারির সব সুযোগ–সুবিধা থাকার পরও ওটি পুরোদমে চালু করা যাচ্ছে না শুধু লোকবলের অভাবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেলের হৃদরোগ সার্জারি (কার্ডিয়াক সার্জারি) বিভাগে কর্মরত আছেন ছয়জন সার্জন। যাদের সপ্তাহে ছয় দিন অস্ত্রোপচার করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু লোকবলের অভাবে এখন মাসে অস্ত্রোপচার হয় সর্বোচ্চ ছয় থেকে সাতটি। ফলে এক যুগ আগে চালু হওয়া এই বিভাগ রোগীদের তেমন কাজে আসছে না। জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভাগটি কখনো সক্ষমতার পুরোপুরি সেবা দিতে পারেনি। শুরুর দিকে সপ্তাহে অন্তত তিনটি ওপেন হার্ট সার্জারি হলেও দিনে দিনে তা কমেছে। অথচ চট্টগ্রামসহ আশপাশের সাতটি জেলা (কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) এর মানুষের কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য একমাত্র সরকারি হাসপাতাল এটি।
জানা যায়, বিভাগটি পূর্ণ সেবা দিতে হলে ৩৫ জন চিকিৎসক, ২৫ জন নার্সসহ ৯০ জনের জনবল চাহিদা দেওয়া হয় শুরু থেকেই। কিন্তু কখনোই তা পূরণ করা হয়নি। বর্তমানে অর্ধেকের কম জনবল, ৪০ জন নিয়ে চলছে কার্যক্রম। তবে ন্যূনতম সেবা দিতে হলেও প্রয়োজন অন্তত ৬০ জন।
চিকিৎসকদের পদের মধ্যে ১২ জন সার্জন, ৪ জন অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট), ২ জন চিকিৎসা কর্মকর্তা, ৪ জন সহকারী রেজিস্ট্রার ও ১ জন রেজিস্ট্রার থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ছয়জন সার্জন, দুজন অবেদনবিদ, একজন রেজিস্ট্রার ও তিনজন সহকারী রেজিস্ট্রার। এছাড়া ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পারফিউশনিস্ট (অস্ত্রোপচারের সময় হার্ট ও ফুসফুস সচল রাখেন) পদে কাউকে নিয়োগই দেওয়া হয়নি। শুরুতে ঢাকা থেকে এনে কাজ চালানো হতো। এখন হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ নার্সকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজটি চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জানা যায়, এই বিভাগটি নয় কোটি টাকা খরচ করে ভবনসহ যন্ত্রপাতি দিয়ে চালু হয়েছিল। কার্ডিয়াক সার্জারি ইউনিটের জন্য যা যা যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, তার সবকিছু দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও পরবর্তী সময়ে যন্ত্রপাতির মেইনটেনেন্সের জন্য বরাদ্দ না দেওয়ায় চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকলেও বিভাগটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়নি।
জানা গেছে, ৪০ শয্যার কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ চালু হয় ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় কার্ডিয়াক সার্জারি, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি, কার্ডিয়াক অ্যানেসথেসিয়া ও ভাসকুলার সার্জারি ইউনিট চালুর কথা ছিল। শুরুতে পরিকল্পনা একসঙ্গে হলেও পরে ভাসকুলার সার্জারিকে আলাদা বিভাগ করা হয়। এখন বহির্বিভাগ, আইসিইউ, অস্ত্রোপচার ও সাধারণ শয্যা্ত এই চার সেবা রয়েছে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে। বিভাগে অস্ত্রোপচার শুরু হয় ২০১৪ সালের এপ্রিলে। তখন থেকে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগটিতে ৯১২টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই ওপেন হার্ট সার্জারি। এখানে ওপেন হার্ট সার্জারির খরচ ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। নগরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই খরচ তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। ঢাকার বাইরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এটিই প্রথম কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ। এই বিভাগে ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য দুটি অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) থাকলেও এখন ব্যবহার হচ্ছে একটি। অন্যটির যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে লাইফ সাপোর্টে রাখার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র চারটি ভেন্টিলেটরের মধ্যে কার্যত সচল একটি। আর হার্ট–লাং ও অ্যানেসথেসিয়া মেশিনের দুটির মধ্যে একটি করে সচল আছে, বাকিগুলো নষ্ট। এসব যন্ত্র চার থেকে পাঁচ বছর ধরে নষ্ট বলে জানা গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন রোগী বিভাগের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। অস্ত্রোপচারের জন্য ভর্তি হন মাসে গড়ে ১০ জন। স্বল্প জনবল দিয়েই এসব রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
এখনো এই অঞ্চলে হৃদরোগের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো যতই হাঁকডাক দিক না কেন, তারা এখনো চট্টগ্রাম মেডিকেলের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। এখানে ২৪/৭ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও নার্স কর্মরত থাকেন ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা প্রদান করেন। ফলে এটি হৃদরোগীদের শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল। তাই এখানে চাহিদামতো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিলে ও নষ্ট যন্ত্রপাতি ঠিক করার ব্যবস্থা করলে তা এই অঞ্চলের জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে। যার সুবিধাভোগী হবে আপামর জনগণ।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।












