চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেই জলাতঙ্কের টিকা

রোগীদের বাড়তি দামে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে চাহিদামতো টিকা আসছে না বলছেন চিকিৎসকরা

জাহেদুল কবির | শুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকার সরবরাহ না থাকায় বাড়তি দামে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে রোগীদের। সরকারি পর্যায়ে সরবরাহ সংকট থাকার কারণে ওষুধের দোকানগুলোতেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে টিকার সরবরাহ নেই। হাসপাতাল থেকে চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও সেই চাহিদা মতো জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ দিতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে প্রতিদিন পোষা কুকুর, বিড়াল, ইঁদুরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর কামড়আচড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে এই টিকা বিনামূল্যে দেয়ার কথা থাকলেও এখন সেই টিকা কিনতে ওষুধের দোকানগুলোতে ভিড় করতে হচ্ছে রোগীদের।

টিকা দিতে নগরীর হালিশহর থেকে জেনারেল হাসপাতালে আসা সিয়াম আহমেদ নামের এক রোগী জানান, বাসায় হঠাৎ করে পোষা বিড়াল পায়ে কামড় বসিয়ে দেয়। দাঁত ফুটার কারণে পা থেকে রক্তক্ষরণ হয়। তাই স্বজনদের পরামর্শে অনেকটা তড়িগড়ি করে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে টিকা দিতে আসি। কিন্তু টিকা দিতে এসে বেশ মন খারাপ হলো। শুনলাম, এখানে জলাতঙ্কের টিকা নাই। অনেকগুলো দোকানে খুঁজতে খুঁজতে এক পর্যায়ে একটি দোকান থেকে বাড়তি দামে এই টিকা কিনতে হলো।

এদিকে জানা গেছে, চট্টগ্রামে সরকারিভাবে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং ফৌজদারহাট বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে রোগীদের বিনামূল্যে জলাতঙ্ক রোগের টিকা দেওয়া হয়। কোনো পোষা বা বন্যপ্রাণী কামড়ালে মোট তিনটি টিকা নিতে হয়। কামড়ানোর প্রথম দিন একটি, তৃতীয় দিন দ্বিতীয়টি এবং কামড়ানোর সপ্তম দিনে তৃতীয়টি। এছাড়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ক্যাটাগরি৩ এবং তীব্র ক্যাটাগরি২ এর অনেক রোগীকে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধক ইমিউনোগ্লোবুলিন নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। বর্তমানে বাইরে থেকে রোগীদের প্রতিটি টিকা কিনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকায়। এছাড়া ইমিউনোগ্লোবুলিন কিনতে হচ্ছে ৮০০ টাকায়। আর্থিক স্বচ্ছল রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনতে সমস্যা না হলেও দরিদ্র রোগীদের এক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এদের একজন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা পরিবহন শ্রমিক আবুল কালাম। তিনি জানান, বাড়ির আঙ্গিনায় তার ৯ বছর বয়সী ছেলেকে কুকুরে কামড় দেয়। স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছেন, বাইরে থেকে টিকা কিনতে হবে। হাতে টাকাও ছিল না। এক আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে টিকা দেন বলে জানান তিনি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. আশিক আমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, বর্তমানে আমাদের কাছে র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের (জলাতঙ্কের টিকা) সরবরাহ নাই। আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ জনের মতো টিকা দিতে আসেন। আমরা চাহিদামতো টিকা পাচ্ছি না। আমাদের চাহিদা থাকে ৫ হাজার। কিন্তু আমরা পাচ্ছি ৮০০ থেকে ১ হাজার। তাই আমরা রোগীদের বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা দিতে পারছি না। তবে টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবার বিনামূল্যে টিকা পাবেন রোগীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোষা বা বন্যপ্রাণী দ্বারা কামড় বা আচড়ে আক্রান্ত হলে দ্রুত আক্রান্ত স্থানে ১৫ মিনিট ধরে সাবান পানি দিয়ে ধুতে হবে। এতে ৮০ শতাংশ জলাতঙ্কের ভাইরাস মরে যায়। পরবর্তীতে দ্রুত কোনো ধরনের পল্লী চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। ডাক্তার আক্রান্তের ধরণ অনুযায়ী ক্যাটাগরি করে চিকিৎসা শুরু করবেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মডার্ন টিকার পদ্ধতি চালু করেছে। এটিতে তিনটি ডোজ নিয়ে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে পূর্ণ ডোজ টিকা দিতে হবে। যেহেতু এই রোগে মৃত্যু নিশ্চিত তাই এক ডোজ টিকা দেয়াটাও বিপদ বয়ে আনতে পারে। দুই ধরনের র‌্যাবিস বা জলাতঙ্ক রয়েছে। একটি হচ্ছে ফিউরিয়াস র‌্যাবিস, আরেকটি হচ্ছে প্যারালাইটিক র‌্যাবিস। এরমধ্যে ফিউরিয়াস র‌্যাবিস খুব ভয়ঙ্কর। এটির ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। এছাড়া প্যারালাইটিক র‌্যাবিস অতটা ভয়ঙ্কর নয়। এতে লক্ষণ সবগুলো প্রকাশ পায় না। তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হলেকুকুর বিড়াল কিংবা অন্যকোনো প্রাণী কামড় ও আচড়ের পরে সেই জায়গায় যদি চুলকায় তবে ধরে নিতে হবে এটি জলাতঙ্ক রোগ। জলাতঙ্ক রোগীরা পানি দেখলে ভয় পান। আলো কিংবা বাতাসের সংস্পর্শে এলে এ ভীতি আরও বেড়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিঃসৃত হয়। অস্বাভাবিক আচরণ করে এবং মানুষ দেখলে কামড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে মারা যায়। এটি এমন এক রোগ যার মৃত্যু অবধারিত।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএনসিটি নিয়ে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে আইনি বাধা কাটল
পরবর্তী নিবন্ধ‘নবযাত্রা’ বুঝে নিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন