আমাদের শহরগুলো আমাদের মতোই জীবন্ত। আমাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য যেমন একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর নির্ভর করে, তেমনি আমাদের শহরবাসীর কল্যাণ আমাদের পায়ের নিচের মাটির প্রাণশক্তির উপর নির্ভর করে। স্বাস্থ্যকর নগর মাটি কেবল ময়লা নয়; ইহা অণুজীব, খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বায়ু এবং পানির সমন্বয়ে গঠিত। মাটি ব্যবহারের একেবারে অনুপযুক্ত হয়ে পড়লে অর্থাৎ মাটির মৃত্যু হলে, মানুষেরও বাঁচার সুযোগ থাকবে না। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এক টেবিল চামচ উপর স্তরের জীবন্ত মাটিতে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি সংখ্যক জীবন্ত অনুজীব বসবাস করছে যারা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে অগণিত সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। প্রকৃতিতে মাত্র ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার মাটি তৈরী হতে সময় লাগে প্রায় ১০০০ বছর। এইভাবে সুদীর্ঘ সময় ধরে যে মাটি তৈরী হয়, মানুষ তাকে অল্প সময়েই ধ্বংস করে দিতে পারি।
জীবন্ত মাটি নগরবাসীকে পানি পরিশোধন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর মান উন্নত করা এবং নগর কৃষির জন্য স্থান প্রদান করে থাকে। এগুলোর পাশাপাশি, সুস্থ শহুরে মাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিকও রয়েছে। শহরের সবুজ স্থান এবং প্রকৃতি মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। পার্ক এবং বাগানে প্রবেশাধিকার, সবুজের উপস্থিতি মানুষের মানসিক চাপ কমাতে, মেজাজ উন্নত করতে এবং সুস্থতার অনুভূতি জাগাতে সহায়তা করে।
কিন্তু মাটি সিলিং, দূষণ এবং নগর সমপ্রসারণ এই সুবিধাগুলিকে হুমকির মুখে ফেলে, বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে, ভূমিকে উত্ত্যক্ত করে এবং আধা–শহুরে জমিতে খাদ্য উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, এবং নগরীর বর্জ্যের অব্যবস্থাপনায় মাটির স্বাভাবিক গঠন, জল ধারণ ক্ষমতা এবং উর্বরতাকে নষ্ট করে দেয়।
পরিত্রাণের উপায় হিসেবে শহরের মৃত্তিকার অপরিস্তরের শক্ত আবরণ অপসারণ, সবুজ ছাদ, নগর গাছপালা ও কৃষি, জৈব সার ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এই গ্রহে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা নির্ভর করছে মাটির সাথে তার মূল্যবান সংযোগের উপর। উন্নত দেশগুলোর শহরের মতো আমাদের বাংলাদেশে যেহেতু প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে শাক–সবজির চাষ ও গাছপালা রোপণের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, সেহেতু একমাত্র ছাদ বাগানই আমাদেরকে পরিবেশগত সুবিধা সুবিধাসমূহ যেমন তাপ হ্রাস, উন্নত বায়ুর মান, বিনোদন, শাকসবজি ও ফলমূলের চাহিদা মেটানো এবং প্রকৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক প্রদান করতে পারে। বাসিন্দারা মাটির টব, প্লাস্টিকের টব এবং বস্তার মতো পাত্র (জিও সিট) ব্যবহার করে শাকসবজি, ফল এবং ফুলসহ বিভিন্ন ধরণের গাছপালা দিয়ে বাগান তৈরি করে একটা সুস্থ শহর উপহার দিতে পারে। ছাদ বাগানের জন্য উত্তম মাধ্যম হলো বেলে দোআঁশ মাটি।
উক্ত মাটির সাথে বিভিন্ন ধরনের জৈব সার যেমন কেঁচোসার, ট্রাইকো কম্পোস্ট, পঁচা গোবর, সামপ্রতিক উদ্ভাবিত ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই কর্তৃক উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। মাটির সাথে জৈব পদার্থের প্রস্তাবিত পরিমাণ হলো আয়তন অনুসারে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
জৈব সার মাটির গঠন উন্নত করে এবং সময়ের সাথে সাথে পুষ্টি সরবরাহ করে। একবার মাটিতে যোগ করলেই কয়েকবার ফসল উৎপাদন করা যায়। পুষ্টির একমাত্র উৎস হিসেবে ছাদ বাগানের গাছের বৃদ্ধির জন্য সাধারণত রাসায়নিক সার ব্যবহার না করাই ভালো, তাতে মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি, বাতাস চলাচল বাধা প্রদান এবং উপকারী অণুজীবের ক্ষতি হতে পারে।
২০২৫ সালের বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের প্রতিপাদ্যে, সুস্থ শহরের জন্য স্বাস্থ্যকর মাটি, শহরগুলিতে মাটির টেকসই ব্যবহারের ভূমিকাকে সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, নগর নেতা, সুশীল সমাজ এবং সর্বত্র নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানায়, যাতে মানুষ এবং প্রকৃতি সুস্থ সবুজ শহরে একসাথে সমৃদ্ধ হতে পারে।
লেখক : প্রফেসর, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।











