হেমন্তের হালকা হিমেল হাওয়ায় দুলছে দিগন্ত বিস্তৃত কৃষি মাঠের সোনালি ধান। শীতের সকালের হালকা কুয়াশা আর মিঠে রোদের মাঝে বিলের আল ধরে ছুটছেন কৃষকরা। কেউ ধান কাটছেন, কেউ সেগুলো আঁটিবেঁধে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। কেউবা সড়কের ধারে ধান মাড়াইয়ে ব্যস্ত। এভাবে চলছে ভোর সকাল থেকে সারাদিন। যেনো দম ফেলার ফুরসত নেই কারো। চট্টগ্রামের শস্যভাণ্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলের ধান কাটার মৌসুম চলছে। এসময়ে বিলের নিত্যকার চিত্র এটি। উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার একাংশজুড়ে বিশাল এ বিল। কথিত আছে এই বিলের উৎপাদিত ধান দিয়ে দেশের মানুষের আড়াই দিনের ভাতের যোগান দেয়া সম্ভব।
কৃষি অফিস সূত্র বলছে, আমন মৌসুমে এবার ১৫ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এরমধ্যে শস্যভান্ডার গুমাইবিলের ৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে এবার আমন রোপণ করা হয়েছে। গেল বোরো মৌসুমে হেক্টর প্রতি ৫.৮ মেট্রিক টন ধান এবং চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩.৮ মেট্রিক টন। তবে এবার উৎপাদন ৬ টন ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছিল। যেখানে হেক্টর প্রতি ৫.২ থেকে ৫.৪ টন ফলন পাওয়া গেছে। ২০২২ সালে উৎপাদিত হয়েছিল ৫ মেট্রিক টন হারে ধান। সর্বশেষ ২০২৪ সালে গুমাই বিলে ৩২০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করে প্রায় ১৬ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছিল। তবে এবার প্রায় ২১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপন্ন হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের। কৃষক তাদের ক্ষেতের ৭০ শতাংশের মত ফসল ঘরে তুলেছেন, মাঠে রয়েছে বাকি ৩০ শতাংশ ধান।
জানা যায়, গেল এক সপ্তাহ ধরে তিন হাজার হেক্টর আয়তনের গুমাইবিলে ধান কাটার ব্যস্ত সময় পার করছেন অন্তত দশ হাজার কৃষক। তাদের সাথে শ্রমিক হিসেবে নেত্রকোনা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের হাজার হাজার শ্রমিকরা কাজ করছেন ধান কেটে কৃষকের গোলায় পৌঁছে দিতে। গত পাঁচ বছর আগেও হেক্টর প্রতি ৪ টন কিংবা ৫ টন গড় ফলন পাওয়া গেলেও এবার উৎপাদন ৬ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
গুমাইঝিল থেকে গুমাইবিলে রূপান্তরিত হওয়া এই বিলের আয়তন একসময় সাড়ে চার হাজারের বেশি হলেও ক্রমাগতভাবে স্থাপনা নির্মাণ হওয়ায় তা এখন ঠেকেছে তিন হাজার হেক্টরে। তবে কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও দিন দিন কমছে আয়তন। এমনকি এই বিলে গড়ে উঠেছে পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটাও। এক শ্রেণির লোকের জমি ব্যবসার সূত্রে বিত্তশালীরা জমি কিনে অপরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করে চলেছে বিলে। ফলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে গুমাই বিলের দৃশ্যপট। ক্রমে বিলুপ্ত হচ্ছে বিলটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, শস্যভাণ্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাই বিলের চারদিকে পাকা ধান। মাঠে কৃষকের পাশাপাশি বাড়িতে ব্যস্ত কৃষাণীরাও। কাঁধে করে বাড়ির উঠানে বয়ে আনা হচ্ছে পাকা ধান। তার সুভাষ ছড়িয়েছে বহুদূর। উঠান থেকে সড়কের পাশে চলছে মাড়াইয়ের কাজ।
মোহাম্মদ জামাল নামে এক চাষি জানান, তিনি ব্রি–ধান–৮৮ ও ৮৯ জাতের আবাধ করেছেন। ইতিমধ্যেই ৮৮ জাতের ধান কেটেছেন। এতে হেক্টর প্রতি ৬.৬ মেট্রিক টন ধান পেয়েছেন তিনি। ৮৯ জাতের ধানেও বেশ ভালো ফলন এসেছে। কৃষক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন জানান, তিনি ২৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে ১০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে তার। এতে তিনি গড়ে ৬.৫ মেট্রিক টন হারে ধান পেয়েছেন।
সিরাজুল ইসলাম নামে একজন কৃষক জানান, এখন ধান কাটা শ্রমিকের চড়া দাম। একজন শ্রমিককে তিন বেলা খাবার, এক প্যাকেট সিগারেট এবং দুই বেলা নাস্তা দেয়ার পর ১২–১৪শ টাকা মজুরি দিতে হয়। এক হেক্টর জমিতে আবাদে এক লাখ ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কেজি ৩০ টাকা হিসেবে হেক্টর প্রতি সাড়ে ৫ টন ধান পাওয়া গেলে প্রায় দুই লাখ টাকার ধান পাওয়া যায়।
এই ব্যাপারে গুমাইবিলে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উত্তম কুমার বলেন, এবার কৃষকরা সময়মতো সঠিক পরিচর্যা করাতে বালাইয়ের হাত থেকে ফসল সুরক্ষিত ছিল। আমরা যারা মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের নিয়ে কাজ করি সকলেই খুবই তৎপর ছিলাম যাতে ফসল বিভিন্ন বালাইয়ের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারি। আমরা ধানি জমিতে পার্সিং অর্থাৎ গাছের খুঁটি পুঁতে দিয়েছি যাতে ধানী জমির বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার মথ পাখি খেয়ে ফসলকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছে। প্রতি সপ্তাহে আমরা আলোক ফাঁদ স্থাপন করে পোকার উপস্থিতি নির্ণয় করে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছি বালাইনাশক স্প্রে করতে হবে কিনা। এবার আমরা আইপিএম পদ্ধতি অবলম্বন করে ফসলের বালাই দমন করেছি। তাই পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে ফলশ্রুতিতে আমন ধানের ফলন আশানুরূপের চাইতেও বেশি হয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বলেন, গুমাই বিলসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। এবছর ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধানের ভালো দাম পেলে লাভবান হবেন কৃষকরা।












