নাহিদের মতো গতিময় পেসার বা ফাস্ট বোলারদর প্রায় সবাই চোটপ্রবণ। টানা লম্বা সময় বোলিং তাই খুব একটা করানো হয় না তাদের। শরীরের ওপর দিয়ে ধকল তো কম যায় নাএ সাধারণত ছোট ছোট স্পেলে কাজে লাগানো হয় তাদেরকে, যাতে প্রতিটি ডেলিভারিতেই নিজেদের নিংড়ে দিতে পারেন। নাহিদের ক্ষেত্রেও বেশির ভাগ সময়ই সেভাবেই হয়ে থাকে। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটি ব্যতিক্রম। নিজের প্রথম পাঁচ ওভারেই পাঁচটি উইকেট আদায় করে নেন তিনি। দু–একটি ডেলিভারিতে তার ক্লান্তি ফুটে উঠছিল বটে। তবে উইকেট এনে দিচ্ছিলেন বলে তাকে আক্রমণে রেখে দেন অধিনায়ক। উইকেট পেতে পারতেন তিনি পরের ওভারেই। কিন্তু এলবিডব্লিউয়ের আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার, বাংলাদেশও রিভিউ নেয়নি। রিভিউ নিলে আরেকটি উইকেট তার হয়ে যেত। পরে আরও একটি ওভার করেন। ২৪ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ধসিয়ে দেন তিনি পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন আপ। তার এমন বোলিং পারফরম্যান্সে বিস্ময় খুব বেশি নেই। ছন্দে থাকলে এমন কিছু তিনি করতেই পারেন। কিন্তু তার টানা সাত ওভার বোলিং বেশ চমকপ্রদই বলতে হবে। নাহিদের নিজের কাছে অবশ্য এটা বড় কোনো ব্যাপার নয়। দলের জন্য এমন কিছু করতে তিনি মুখিয়ে থাকেন বলেই জানালেন। ‘আমি সবসময় দলের জন্য চিন্তা করি যে, আমার কাছে দল কী চায়, ওই জিনিসটা আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে সবসময় চেষ্টা করি। আজকে যখন উইকেট পাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমার বোলিং তাদের জন্য খেলা সমস্যা হচ্ছে, তো আমি এই জিনিসটা লম্বা সময় ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম। এর জন্য হয়তো অধিনায়ক চেষ্টা করছে যে, আরও দুই–একটা ওভার করানো যায় কি না।’ কোচ–অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে তিনি বার্তা পেয়েছিলেন মনের মতো করে বোলিং করার। সেখানেও তিনি বললেন, লম্বা সময় বোলিং করার জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করে তুলছেন তিনি। তাদের পরিকল্পনা ছিল একটাই যে, ‘তুমি মন খুলে বোলিং করো এবং যে জিনিসটা পারো, মাঠে তা এক্সিকিউট করো।’ পেশাদার হিসেবে প্রত্যেকটি ক্রিকেটারের আসলে ফিট থাকা উচিত এবং যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে লম্বা সময় বোলিং করতে হতে পারে কিংবা দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী করতে হবে। দলের যদি মনে হয় যে, সাত ওভার এক স্পেলে কিংবা যদি দশ ওভার এক স্পেলে করা লাগে, তো করতে হবে। কারণ দল যেটা চায়, সে জিনিসটা আমি মনে করি পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে ওভাবে নিজেকে ফিট রাখা উচিত এবং নিজের ফিটনেসটা ধরে রাখা উচিত।’ ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথমবার ৫ উইকেট পেয়ে নাহিদ রানার জবাব, ‘ফিলিং নরমাল।’ চাপাইনবাবগঞ্জের ছেলেকে এখন তো ‘চাপাই এক্সপ্রেস’ বলা যায়! নাহিদ এবার বলেন, ‘আমি একটা নরমাল মানুষ।’ রঙিন পোশাকে দেশের হয়ে তার সেই রুদ্ররূপ প্রথমবার দেখা গেল এবার। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ২৪ রানে শিকার ৫ উইকেট। গতি ও বাউন্সের মিশেলে ভয়ঙ্কর বোলিংয়ে ভীতি ছাড়ান প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইন আপে।
ম্যাচ–সেরা হয়ে যখন সংবাদ সম্মেলনে এলেন, তার কাছে জানতে চাওয়া হলো অনুভূতি। কিন্তু তার বোলিং যতটা রোমাঞ্চকর, প্রতিক্রিয়া ততটাই ম্রিয়মান।‘সামনে চেষ্টা করব যে কীভাবে এই জিনিসটা লম্বা সময় ধরে রাখা যায়।’ ‘আমি নিজেকে কোন ব্র্যান্ড মনে করি না। আমি মনে করি আমি একটা নরমাল মানুষ এবং চেষ্টা করি যে কীভাবে ভালো ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারব।’ ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ৫ উইকেট কাউকে উৎসর্গও করলেন না আলাদা করে, ‘নাহ, স্পেশাল কোনো কিছু না। চেষ্টা করব যাতে এই জিনিসটা লম্বা সময় চালিয়ে যেতে পারি।’ কাউকে উৎসর্গ না করলেও এই পারফরম্যান্সের জন্য ধন্যবাদ জানালেন তিনি সতীর্থ দুই পেসারকে। বাংলাদেশের বোলিংয়ের সূচনা করেন এ দিন তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান। নাহিদ জানালেন, অভিজ্ঞ দুই পেসারের সঙ্গে কথা বলে তিনি ধারণা পেয়েছেন উইকেট সম্পর্কে। ‘সারপ্রাইজিং না (উইকেটের আচরণ) কারণ এই প্রথমে ফিজ ভাই এবং তাসকিন ভাই বোলিং করছিল, তাদের সাথে কথা বলছিলাম মাঠের মধ্যে যে, উইকেটে কী হচ্ছে না হচ্ছে। তারা তখন বলল, উইকেটে হিট করলে কিংবা একটা জায়গাতে লাইন–লেংথ ধরে রাখলে ব্যাটসম্যানদের জন্য খেলা কঠিন। আমি ওই জিনিসটা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি।’
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন তিনি আড়ালের একজনের প্রতিও। বোলিং কোচ শন টেইটকে তারা পাশে পান বন্ধু ও অভিভাবকের মতো করে। ‘কোচ হিসেবে উনি (টেইট) আউটস্ট্যান্ডিং, একজন কোচ এবং বন্ধু হিসেবে আমাদের সঙ্গে মিশে থাকেন এবং আমাদের যখন যেটা লাগে, তিনি তখন সেই জিনিসটাই আমাদেরকে দে। আমাদেরকে সবসময় বলেন যে, ‘তুমি তোমার শক্তির জায়গায় থাকো এবং তোমার যা লাগবে তুমি আমাকে বলবে, আমি তোমাদেরকে গাইড করার জন্য আছি। তোমরা খেলবে মাঠে, আমি তোমাদেরকে পরিকল্পনা দেব, তোমরা এক্সিকিউট করবে এবং ম্যাচ জেতাবে।’ এভাবেই তিনি সবসময় আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে কথা বলেন এবং সবসময় হচ্ছে সেরা চেষ্টা করেন।’










