গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তাঁরা বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সাংবাদিকতার পেশা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে গত শনিবার সকালে বাংলাদেশ সংবাদপত্র মালিক সমিতি (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত গণমাধ্যম সম্মিলনে এ আহ্বান জানানো হয়। বিশিষ্ট সম্পাদক ও গণমাধ্যম নেতারা বক্তব্য রাখেন। নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, একটি দেশের গণমাধ্যমের বিকাশ জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণমাধ্যম সঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে সমাজের বিভিন্ন অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার এবং বৃহত্তর সামাজিক সংগ্রামে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম না থাকলে সত্য বলার কেউ থাকে না। স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সমর্থন করা শেষ পর্যন্ত সমাজেরই উপকারে আসে। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সম্মিলনে অংশগ্রহণকারীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ সামপ্রতিক সময়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার সমালোচনা করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানান। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিভাজন কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হলে সাংবাদিকরা ব্যক্তিগতভাবে হামলার শিকার হতে পারেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সব সরকারের আমলেই গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের সংহতি ও ঐক্য অপরিহার্য।
সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মিলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের এ যুগে যেখানে মিডিয়া সম্পূর্ণ মুক্ত, সেখানে তার ওপর আঘাত নিতান্তই দুঃখজনক। সব জাতি, সমাজ ও বিশ্বপরিমণ্ডলকে প্রভাবিত ও অবগত করে মিডিয়া। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির উত্তরণ ও বিস্ময়কর অগ্রগতিতে মিডিয়ার যে বিস্তার ঘটেছে, তা কল্পনাতীত। যুগের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিডিয়া পৌঁছে যাচ্ছে গোলার্ধের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মিডিয়ার কণ্ঠরোধ বা নিয়ন্ত্রণ এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে তথ্য প্রযুক্তির অবাধ সংযোজনে। বলা যেতে পারে, মিডিয়া এখন পূর্বেকার সময়ের চাইতে বেশি স্বাধীনতামুখী, সার্বভৌমত্ব প্রত্যাশী ও শক্তিধর।
সাংবাদিক সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করে। সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবাধিকার সংরক্ষণ, অন্যায়–অবিচার–শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধাচরণ, দুর্বল জনগোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন এবং নৈতিক আদর্শে অবিচল এমন মানুষ বা পেশাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। কেননা, আমরা জানি সমাজে সুশাসনের সমস্ত ধারণাই শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম দ্বারা পরিচালিত হয়। গণমাধ্যমের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিকের মধ্যে রয়েছে : সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার মূল্যায়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে সম্যক ধারণা প্রদান, অবাধ তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করা।
সৎ সাংবাদিকতা সবসময় সত্যেরই আরাধনা করে। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকে আঁকড়ে ধরে মিডিয়া এগিয়ে যায়। এর একটু এদিক ওদিকে হলে অগ্রগতি ব্যাহত হয়, উন্নয়ন হয় বাধাগ্রস্ত। গণতন্ত্র বিকাশের পূর্বশর্ত হিসেবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুমাত্রিকতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এ ব্যাপারে সরকারের দায়বদ্ধতা দরকার, যাতে করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুমাত্রিকতাকে মূল উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটা এমন নয় যে, সরকার যা শুনতে চায়, গণমাধ্যমে তা প্রতিফলিত হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম জনগণের মধ্যে তাদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। সমাজের স্থিতিশীলতা ও মসৃণ গতিময়তার জন্য আইনের শাসন একটি মৌলিক বিষয়।
গণমাধ্যমের একটা দায়–দায়িত্ব আছে। কোন্ খবর ফলাওভাবে প্রচার করবো, আবার কোন্ খবর ছোট করে হবে– তা নির্ভর করে সংবাদকর্মীর বিবেক ও সামাজিক দায়বোধ থেকে।
এ কথা সত্য, সংবাদপত্র বা টিভির সম্পাদক–প্রকাশক বা মালিকের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভাবাদর্শগত অবস্থান এবং নিজস্ব এজেন্ডা থাকা অস্বাভাবিক। বিশেষ মতাদর্শ বা রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য বা সহানুভূতি থাকাও বিচিত্র নয়। তবু আমরা মনে করি, দলের লেজুড়বৃত্তি থেকে আমাদের উর্ধ্বে থাকা দরকার। তাহলেই জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে মিডিয়ার প্রতি।








