গণভোটের গণরায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন ও সরকার গঠিত হয়েছে দাবি করে সেই গণভোটের রায়কে বাতিল করার জন্য আদালতকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি’র আহবায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি। তিনি বলেন, আদালতকে আবারো দলীয়করণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আদালতকে যদি রাজনৈতিক এজেন্ডা ও নিজেদের দলীয় এজেন্ডার কারণে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয় তার পরিণতি খুবই করুণ হবে। আওয়ামী লীগ সরকার এ পথেই পতনের দিকে গিয়েছিল। ফলে এখন যারা সরকারে আছেন আপনাদের প্রতি স্পষ্ট আহবান থাকবে, গণভোটের গণরায় দ্রুত বাস্তবায়ন করুন। গণভোটের গণরায়ের মাধ্যমে এই বাংলাদেশ, নতুন সরকার ও নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হোক। গতকাল সোমবার নগরের দ্য কিং অব চিটাগাং কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এনসিপির বিভাগীয় সাংগঠনিক ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি এবং এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ ছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম–১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ও চট্টগ্রাম–১৬ আসনে সংসদ সদস্য জহিরুল ইসলাম। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি অংশ নেবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ৩০০ আসনে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতাম। আপনারা অনেকেই প্রার্থী ছিলেন। আপনারা এবার ইলেকশনে অংশগ্রহণ করতে পারেন নাই। আপনাদের জন্য আমাদের মেসেজটি হচ্ছে আপনারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ ১১ দলকে যে ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছিল, আমরা সেই ভোট ধরে রাখতে পারি নাই। সেই ভোট যদি আমরা সম্পূর্ণভাবে ধরে রাখতে পারতাম নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতো। যেটা জাতীয় নির্বাচনে আমরা পারি নাই, সেটা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা করে দেখাতে চাই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি ছয়টি আসন জিতে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেছে। এই কাজটি কোনো সহজ কাজ ছিল না। রাজপথের গণঅভ্যুত্থান থেকে জাতীয় সংসদে পৌঁছেছে। পৃথিবীর অনেক দেশের সামপ্রতিক সময়ের গণঅভুত্থ্যান যদি আপনারা দেখেন। যেখানে ছাত্র তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে। বেশিরভাগ দেশেই পুরনো বন্দোবস্ত, বিদ্যমান স্টাব্লিসমেন্ট নতুন নেতৃত্বকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াইতে দেয় নাই। একই ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছিল। ৫ অগাস্টের পর থেকে এই তারুণ্যের শক্তিকে দমন করার জন্য নানান শক্তি–অপশক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে। এই নির্বাচনে সর্বাত্মকভাবে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনগণের সহযোগিতায় ১১ দলের সমর্থনে এনসিপি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছয়টি আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি ফ্যাসিস্টদের আস্ফলন চট্টগ্রামে কমে নাই। ফ্যাসিস্টদের আস্ফলন চট্টগ্রামে নানান সময় আমরা দেখতে পাই। একটা কথা পরিষ্কার, এনসিপি এবং পতিত আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট একসাথে থাকতে পারে না। যেই জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম শুরু হবে সেই জেলায় হয় আওয়ামী লীগ থাকবে, নয় এনসিপি থাকবে। এনসিপির যদি ১০ জন নেতাকর্মীও থাকে সেই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রম, নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট সংগঠনের কোনো অফিস যাতে খোলার সুযোগ না পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নেতৃত্বে এ লড়াই সফল হবে না। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, যাতে কোনো চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীর এই শহরে ঠাঁই না হয়।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের হাইকোর্টে দু’টি রিট করা হয়েছে। এই দু’টি রিটের মধ্যে দিয়ে জুলাই সনদ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট, গণভোটের ফলাফল এবং সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকে আজকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এটা কোনো আইনের প্রশ্ন নয়। এটা প্রকৃত অর্থেই একটা পলিটিক্যাল কোশ্চেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রশ্ন সমাধানের দিকে যায় না। কিন্তু আমরা খেয়াল করে দেখছি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে একটা জুডিশিয়াল স্টেটে পরিণত করার চক্রান্তের জায়গা থেকে পলিটিক্যাল কোশ্চেনকে কোর্টের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আখতার হোসেন বলেন, কোর্টকে মনে রাখতে হবে তারা যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে অগ্রসর হতে চায়, যদি তারা ক্ষমতার ভারসাম্য বিশ্বাস করে, যদি তারা সেপারেশন অফ জুডিশিয়ারি সেপারেশন অফ পার্লামেন্ট, সেপারেশন অফ এঙিকিউটিভ এ যদি বিশ্বাস করে তারা কোনোভাবে পলিটিকাল কোশ্চেনকে তারা কোর্টকে ইন্টারফেয়ার করতে পারবে না।
তিনি বলেন, আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিচারালায় এবং বাংলাদেশে যারা ক্ষমতায় আছেন বিএনপিকে আমরা বলতে চাই, জনগনের অভিপ্রায়ের বাইরে, জুলাই সনদের বাইরে, গণভোটের রায়ের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, পরিণতি ভালো হবে না। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আমরা শুনছি সংসদের অধিবেশন বসার কথা হলেও উচ্চকক্ষ বা সংবিধান সংস্কার নিয়ে কোনো স্পষ্ট উদ্যোগ নেই। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ আবু সাঈদসহ হাজারো শহীদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান দেখাতে হলে একই দিনে সংসদ ও সংস্কার পরিষদ দুটিই কার্যকর করতে হবে। যারা সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, তারা জনগণের রায়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে অনেক চাঁদাবাজ রয়েছে। আমাদের লড়াই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। আপনি বিএনপি করতে পারেন, জামায়াত করতে পারেন, কিংবা এনসিপি করতে পারেন। কিন্তু, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কোনো দলীয় পরিচয় নেই। যারা এসব অপরাধে জড়িত, তাদের আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের ছয় জন সংসদ সদস্য সংসদে গেছেন জনগণের সমর্থনে, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা দুর্নীতির মাধ্যমে নয়। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের ভরসা রাখতে হবে জনগণের ওপর, কোনো সিন্ডিকেট বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর নয়।
তিনি বলেন, মাদকসম্রাট ইয়াবা বদিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বললাম মাদকের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধে যাব। আর তারা মাদকের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে চায়। বাংলাদেশ এবং মাদক একসাথে চলে না। হয়তো মাদক থাকবে অথবা বাংলাদেশ থাকবে। এজন্য যারা ইয়াবাবদিকে বের করেছে নিশ্চয় তাদের কোন অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা শুনতে পাচ্ছি বিশেষত চট্টগ্রামে মানুষের দোকানপাট ও দখল জায়গা জমি দখল হচ্ছে। অনেকে ক্ষমতার তুচ্ছ ব্যবহার করছে। আমরা তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাচ্ছি। চট্টগ্রামের ছাত্র জনতা যদি আবার জেগে উঠে, একজনে তো পালিয়েছে ইন্ডিয়া, আপনাকে পালাতে হবে বঙ্গোপসাগরে। ইন্ডিয়া আশ্রয় দিয়েছিল সেখানে বেঁচে আছে, বঙ্গোপসাগরে নামবেন কিন্তু বাঁচবেন না আপনারা।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রমজানপরবর্তী বাংলাদেশকে সামনে রেখে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে চট্টগ্রামের প্রতিটি উপজেলা, প্রতিটি ইউনিয়ন ও প্রতিটি ওয়ার্ডে জাতীয় নাগরিক পার্টির সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্ত ও বিস্তৃত করা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডসহ সর্বত্র আমাদের কমিটিগুলো কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা আর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী চরিত্রের কোনো নতুন রূপান্তর দেখতে চাই না।











