খাতুনগঞ্জে ৮ জনের সাড়ে ৪ কোটি টাকা নিয়ে ব্যবসায়ী আত্মগোপনে

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ১৯ জুলাই, ২০২১ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারী বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে অর্থ আত্মসাৎ করে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এবারও খাতুনগঞ্জের আল মদিনা ট্রেডিং কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী হাজী মো. আবদুস সালামসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ৮ ব্যবসায়ীর সাড়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। কোতোয়ালী থানার মামলা নম্বর-২১। গত শনিবার খাতুনগঞ্জের সোনা মিয়া মার্কেটের ফেরদৌস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইউনুছ বাদী হয়ে এ মামলা করেন। মামলার অপর আসামিরা হলেন-শাহাদাত হোসেন (২৬) ও তারেক হোসেন নোবেল (২৩)। তারা দুজনই ১ নম্বর আসামি আবদুস সালামের ছেলে। মামলা এজাহারে বাদী মোহাম্মদ ইউনুছ উল্লেখ করেন, ১ নম্বর আসামি হাজী মো. আবদুস সালাম বিগত ২৫-৩০ বছর যাবত ব্যবসা করে আসছেন। তাঁর বর্তমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নুরুল আবছার মার্কেটের বিপরীতে আল মদিনা ট্রেডিং কর্পোরেশন। এটি সর্বজন স্বীকৃত যে, খাতুনগঞ্জ এলাকায় একে অপরের সাথে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। ব্যবসার সুবাদে আমার মালিকানাধীন মেসার্স ফেরদৌস ট্রেডিংয়ের নামে ৬ হাজার ৬০০ মণ পরিশোধিত পাম অয়েল কেনা বাবদ ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯২ হাজার ১৫০ টাকা উত্তরা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১ নম্বর আসামির নামে ট্রাস্ট ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করি। একইভাবে মেসার্স পরিতোষ রায়ের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ রায় ৭৫০ মণ পরিশোধিত পাম অয়েল কিনতে ৩০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা স্থানান্তর করেন। এছাড়া
মেসার্স আজাদ সিন্ডিকেটের স্বত্ত্বাধিকারী এরশাদুর রহমান রাশেদ ৭৫০ মণ পাম অয়েলের জন্য ৩০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, মেসার্স দ্বীন সিন্ডিকেটের স্বত্ত্বাধিকারী এস এম জামাল উদ্দিন এক হাজার ৫০ মণ পরিশোধিত পাম অয়েল কেনার জন্য ৪২ লাখ ২০ হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে আসামির মালিকাধীন আল মদিনা ট্রেডিং কর্পোরেশনের উত্তরা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার হিসাবে ২৪ লাখ ৫ হাজার ৪০ টাকা এবং অবশিষ্ট ১৮ লাখ ১৫ হাজার ৩০ টাকা জামাল উদ্দিনের ব্যবসায়িক বন্ধু মো. এনামুল হক চৌধুরীর ইউনিয়ন ব্যাংকের হিসাব থেকে আসামির ট্রাস্ট ব্যাংকে স্থানান্তর করেন। এছাড়া কিবরিয়া ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম কিবরিয়া ৭৫০ মণ পরিশোধিত পাম অয়েল কেনার জন্য ৩০ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এনসিসি ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১ নম্বর আসামির ট্রাস্ট ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করেন।
এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়, এইচ এ ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী মো. নুরুদ্দিন রুমন ৩০০ মণ পাম অয়েল কেনার জন্য ১২ লাখ ২৩ হাজার ২০০ টাকা ইউনিয়ন ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে স্থানান্তর করেন। এছাড়া মো. আইয়ুব ৩০০ মণ পরিশোধিত পাম অয়েল কেনার জন্য ১২ লাখ ১৭ হাজার ২০০ টাকা গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার চেকমূলে পরিশোধ করেন। অন্যদিকে মো. জাহাঙ্গীর আলম ৭৫০ মণ পাম অয়েল কেনার জন্য ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৭০০ টাকা উত্তরা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১ নম্বর আসামির মেসার্স আল মদিনা ট্রেডিং কর্পোরেশনের অনূকুলে উত্তরা ব্যাংক সদরঘাট শাখায় স্থানান্তর করেন। অবশিষ্ট ১২ লাখ ৩ হাজার ৩০০ টাকা আসামির ট্রাস্ট ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় স্থানান্তর ও নগদ ৪ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করেন। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার ২৫০ টাকা সিটি গ্রুপের পরিশোধিত পাম অয়েল কেনার জন্য আমরা সকলেই ১ নম্বর আসামির ব্যাংক হিসাবে জমা করি। গত ১৫ জুলাই আমিসহ উল্লেখিত ব্যবসায়ীরা পাম অয়েল কেনার ডি.ও/এস.ও সংগ্রহ করতে বিকাল আনুমানিক ৩ টার দিকে ২৩৬, খাতুনগঞ্জ অগ্রণী ব্যাংকের বিপরীতে নুরুল আবছার মার্কেটের মদিনা ট্রেডিং কর্পোরেশনের অফিসের সামনে গিয়ে তাদের অফিস তালাবদ্ধ দেখতে পাই। পরবর্তীতে ১ নম্বর আসামি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তাঁর নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। মোবাইল বন্ধ পাওয়ায় ১ নম্বর আসামির ছেলে ২ নম্বর আসামি শাহাদাত হোসেন এবং ৩ নম্বর আসামি তারেক হোসেন নোবেলের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে উভয়ের নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আমিসহ আমার সাথের ব্যবসায়ীরা আসামিদের বর্তমান ঠিকানায় গিয়ে দেখি যে, আসামিরা স্বপরিবারে বাসা তালাবদ্ধ করে আত্মগোপনে চলে গেছেন। আসামিরা পরস্পর যোগাসাজশে পরিশোধিত পাম অয়েল বিক্রি বাবদ ৪ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার ২৫০ টাকা টাকা গ্রহণ করে ডি.ও/এস.ও বুঝিয়ে না দিয়ে প্রতারণামূলক অর্থ আত্মসাত করেছেন।
এ ব্যাপারে মামলার বাদী মোহাম্মদ ইউনুছ দৈনিক আজাদীকে বলেন, খাতুনগঞ্জে বিশ্বাসের ওপর এখনো শত শত কোটি টাকা লেনদেন হয়ে আসছে। আল মদিনা ট্রেডিংয়ে আবদুস সালাম খাতুনগঞ্জে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা করে আসছে। আমিসহ ৭ ব্যবসায়ী পাম অয়েল কেনার জন্য তাকে ৪ কোটি ৫৪ লাখ ১০ হাজার ২৫০ টাকা পরিশোধ করি। গত ১৫ জুলাই দুপুর আড়াইটার সময়ও আসামিদের সাথে আমাদের কথা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ডি.ও/এস.ও সংগ্রহ করতে গেলে দেখা যায় তার প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ। পরে বুঝতে পারলাম তিনি আমাদের টাকা আত্মসাত করে আত্মগোপন করেছেন। তাই থানায় মামলা করেছি। এছাড়া আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অবহিত করেছি। কারণ আমরা টাকাগুলো আমাদের ব্যাংক হিসাব থেকে আবদুস সালামের আল মদিনার ট্রেডিংয়ে অনূকুলে ট্রান্সফার করেছি। ব্যাংককে বলেছি, আবদুস সালামের উপস্থিতিতে যেন টাকাগুলো উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়।
মেসার্স আজাদ সিন্ডিকেটের স্বত্বাধিকারী এরশাদুর রহমান রাশেদ বলেন, গত এক বছর আগে আবদুস সালামের ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। তখন তাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে নুরুল আবছার মার্কেটের এক ব্যবসায়ী সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন, আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে-তিনি ওই ব্যবসায়ীর এক টাকাও আটকায়নি। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং চট্টগ্রাম চেম্বার বরাবর আমরা অভিযোগ করেছি।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতোয়ালী থানার ওসি নেজাম উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মামলা করেছেন খাতুনগঞ্জের এক ব্যবসায়ী। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে আল মদিনা ট্রেডিং কর্পোরেশনের স্বত্ত্বাধিকারী হাজী মো. আবদুস সালামকে ফোন করা হলে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসরকারি টাকায় কেনা লিফট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে!
পরবর্তী নিবন্ধপানছড়িতে সাবেক ইউপিডিএফ কর্মী গুলিতে নিহত