ক্রমশ বিলুপ্তির পথে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনগুলোর কার্যক্রম!

সাইফুদ্দিন আহমদ সাকী | বৃহস্পতিবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আজ থেকে প্রায় ষাট সত্তর আশিদশকের দিকে শীত এলেই ডিসেম্বর মাস থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোন না কোনদিন পাড়ায় মহল্লায় শহরেবন্দরে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সার্কাস ও খেলাধুলা আয়োজনের ধুম পড়ে যেত।

প্রতিটি বাড়িতে বা মহল্লায় তখন তরুণ যুবকরা মিলেমিশে ক্লাব, সংঘ, পাঠাগার করত। সেইসব সংগঠন নিয়মিত কর্মকাণ্ডের সাথে বছর শেষে ফুটবল, ভলিবল, কেরাম, ব্যাডমিন্টন, দাবা, লুডু খেলার পাশাপাশি দেয়ালিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশ, আবৃত্তি, চিত্রাংকন, সংগীত, বিতর্ক, কেরাম, ফুটবল, দাবা খেলা ইত্যাদি প্রতিযোগিতার আয়োজন করত। এলাকার স্কুলকলেজের ছেলেমেয়েরা এত অংশ নিত।

কিন্তু নগরায়ন ও আধুনিক জীবনযাত্রার দৌড়ে আজ সেই সব ক্লাব, সংঘ, পাঠাগার কিংবা সমিতি ক্রমাগতভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। তখন বৈকালীন সময় ছেলেদের কেউ কেউ পাঠাগারে বই পড়ার পাশাপাশি কেরাম বা দাবা খেলত। আর কেউ কেউ মাঠে ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন খেলত।

কিন্তু এখন আর সেইসব ক্লাব বা সংঘ দুয়েকটা ব্যতিত খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দিন পাল্টিয়েছে। পাল্টিয়েছে সমাজচিত্র, জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপট। আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সেই আগের পুরানোধাঁচের সামাজিক সাংস্কৃতিক শিল্পসাহিত্যের চর্চা বা আনন্দ উৎসব নতুন প্রজন্মের জেন জিদের কাছে একেবারে পুরোনো সেকেলর কল্পকাহিনির মত।

চট্টগ্রাম নগরীর কাট্টলী এলাকা সেই ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে পঞ্চাশ থেকে আশিনব্বই দশকেও রাজনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়ায় ছিল এক উল্লেখযোগ্য তীর্থভুমি।

ষাট সত্তর আশি দশকে উত্তর কাট্টলীর বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় আনুমানিক ছোট এবং বড়দের প্রায় ১৫/১৬ টি সংঘ বা ক্লাব ছিল। জাতীয় শিশু সংগঠনের মধ্যে সারথী খেলাঘর আসর এবং নিপবন কচিকাঁচার মেলা নানা শিল্পসাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। সেই সময় সুরতান এবং সপ্তক নামে দুটি সংগীত চর্চার স্কুল ছিল। যেখানে এলাকার ছেলে মেয়েরা নাচ, গান, তবলা, গীটার ইত্যাদি শিক্ষা নিত। কাট্টলীর বহু সংগঠনের মধ্যে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত দুটির নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হল, কাট্টলী ইয়াং ম্যান এসোসিয়েশন এবং অপরটি হল কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাব। এই ইউনিয়ন ক্লাব থেকেই ১৯২৯ সালের ২১ জানুয়ারি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কাট্টলীর কৃতীপুরুষ বহুগ্রন্থের রচয়িতা ইসলামি গবেষক মাওলানা তমিজুর রহমান কবিকে নিবেদন করে একখানা মানপত্র রচনা করেন এবং তা পাঠ করা হয়। মাত্রপত্রটি পাঠ করার সময় কবি নজরুল লেখকের প্রসংশা করে তাকে জড়িয়ে ধরেন। এই দুটি সংগঠনের পাশাপাশি পাকিস্তান আমলে তরুণ যুবকরা স্থাপন করে কাট্টলী সাধারণ পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তখন কর্ণেলহাট কেন্দ্রিক আরো যেকটি সংঘ/ক্লাব গঠিত হয়, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সবুজ সংঘ, উদয়ন সংঘ ও প্রগ্রেসিভ ক্লাব। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সবুজ সংঘ ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। প্রতিবছর এই সবুজসংঘের উদ্যোগে নাটক, যাত্রা, সার্কাস, বিচিত্রানুষ্ঠান ও ইনডোর খেলাধুলার আয়োজন সবার নজর কাড়ত। মনে আছে ১৯৭৬ সালের ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারিতে সবুজ সংঘ কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশাল প্যান্ডেল করে প্রায় তিন হাজার দর্শকের জন্য বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রসিদ্ধ শিল্পীর সাথে ঢাকা থেকে আগত জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। দুইদিনের এই বিশাল আয়োজনে যে সমস্ত শিল্পীরা গানে, নাচে, অভিনয়ে ও সংলাপে অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন দেশের কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, পপশিল্পী পিলু মমতাজ, মেলোডি শিল্পী বশীর আহমেদ, খন্দকার ফারুক আহমেদ, খুরশীদ আলম, আবদুল আলীম স্থানীয় প্রবাল চৌধুরী, শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণ, কল্পনা লালা। নৃত্যে চলচ্চিত্র শিল্পী শরবরী, সাকিলা, স্‌হানীয় রুনুবিশ্বাস, জরিনা, অভিনয়ে খান জয়নুল, হাসমত, সংলাপ ও অভিনয়ে আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা, গোলাম মোস্তফাসহ অনেকেই। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন বিখ্যাত সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী ও তাঁর দল। তিনি সমস্ত বাদ্যযন্ত্র ঢাকা থেকে গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে এসেছিলেন।

অনুষ্ঠান শুরু হবার আগেই মাঠে চেয়ার পূর্ণ হয়ে যায় এবং টিকেট না পেয়ে বহু দর্শক মাঠের বাহিরে থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। আমি তখন ইন্টার পড়ুয়া ছাত্র এবং সাপ্তাহিক সিনে পত্রিকা চিত্রালী, পূর্বানী ও সিনেমায় লেখালেখি করছি। পুরো দুদিন কাছ থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করা ও শিল্পীদের কাছে গিয়ে অটোগ্রাফ নেবার সুযোগ আমার হয়েছিল।

উক্ত মাঠে শুধু সবুজ সংঘ নয় অন্যান্য সংঘ বা ক্লাবেও নাটক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। কখনো কখনো সার্কাসের আসর বসত। আবার এই মাঠে প্রতিবছর জমজমাট ফুটবল খেলার আয়োজন হত। কাট্টলী কৃতিসন্তান বিশিষ্ট ইংরেজি ক্রীড়া ভাষ্যকার মোঃ সিরাজুদ্দৌলাহ তাঁর পিতার নামে ‘মোঃ মসিউদ্দৌল্লাহ গোল্ড সীল টুর্নামেন্টের আয়োজন করতেন। এলাকার বিভিন্ন ক্লাব ও মিলকারখানা এই টুর্নামেন্টে অংশ নিত। খেলায় দেশের বিখ্যাত খেলোয়াড়রা অংশ নিতেন। এর মধ্যে দুয়েকজনের নাম উল্লেখ না করেলে নয়, তারা হল মেকওয়া, বেলাল, সুধীর, শংকর, আবু তাহের পুতু, এয়ার মোহাম্মদ, মারী, ইসলাম, বিধুচাকমা প্রমুখ।

তৎকালীন সময়ে কাট্টলীতে তরুণ যুবকদের গঠিত প্রায় প্রত্যাক বাড়ি বা পাড়ায় ক্লাব বা সংঘ ছিল, তারমধ্যে যে কটির নাম মনে পড়ছে তা হলশতদল সংসদ, যুবসংঘ, প্রতীতি, একতা সংঘ, বয়েজ ক্লাব, নবারুন, মিতালী সংঘ, দিপালী, প্রত্যয়, উপল, ইত্যাদি। এইসব ক্লাব বা সংঘ প্রতিবছর খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটকের আয়োজন করত। এতে এলাকার স্কুলকলেজের ছেলেমেয়েরা অংশ নিত এবং জাঁকজমক অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হত। কর্ণেল হাট নুরুল হক চৌধুরী হাই স্কুল মাঠ ছাড়াও পাড়ায় পাড়ায় নাটক হত এতে পেশাদারদের সাথে স্থানীয়রা অভিনয় করত। বর্তমানে এইসব সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্রীড়া সংগঠনগুলো প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি ভ্রাতৃত্ববোধ, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক সৃষ্টিতে এবং সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির বিকাশে অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপবিত্র বাইতুল্লাহ বা কাবা শরিফ প্রথম দেখায় যে দোয়া পড়বেন
পরবর্তী নিবন্ধড. মইনুল ইসলামের কলাম