বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে–জনগণকে ভোট দেয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করা। কোনো বিশেষ কারণে ভোট দেয়ার জন্য সরকারের বলা উচিত না। সরকারের লোকজনের বলা উচিত না। ভোট বলতে ভোট। কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে ভোট দেয়ার কথা বলবে, আর একটাকে বাইরে রাখবে। এই ধরনের কথাবার্তা বলা ভালো না, মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে।
গতকাল নগরীর নাসিরাবাদ (বালক) উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গাউসুল আজম মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (ক.) দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী এবং ১২০তম বার্ষিক ওরশ উপলক্ষে আয়োজিত শিশু–কিশোর সমাবেশে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। মাইজভাণ্ডারী একাডেমি সমাবেশটির আয়োজন করে।
আমীর খসরু মাহমুদ আরো বলেন, সরকারকে বলবো, ভোট দেয়ার জন্য আপনারা জনগণকে উৎসাহিত করুন। সার্বিকভাবে সব ভোটের কথা বলতে হবে। সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের যে ভোট, বিভিন্ন দলকে তারা যে ভোট দিবে, এটাই তো আসল ভোট, তাই না? সেই কথা না বলে, শুধুমাত্র এক ভোটের কথা বলবেন, আর আরেক ভোটের কথা বলবেন না। এটা উচিত না। আমরা সব ভোটের কথা বলতে বলতেছি। এর আগে শিশু কিশোর সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশকে গড়তে হলে শিশুদের নিয়ে চিন্তা করা দরকার। আপনার সন্তান ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ যাই হোক না কেন আগে তাকে একজন সৎ ও ভালো মানুষ হতে হবে। শিশু–কিশোরদের উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীলতাকে বের করে আনতে বড়দের ভূমিকা রাখতে হবে। চীনে স্কুল থেকেই ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা নিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছে। তারা ইলেকট্রিশিয়ান, কার্পেন্টার, প্লাম্বার ইত্যাদি পেশার মানুষ তৈরি করছে। ফলে ওসব দেশে শিক্ষিত বেকারের হার কম। আমরা কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি। আমেরিকায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দুই–আড়াই হাজার নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রজেক্ট জমা পড়ে। আমরা এতো বছরেও দুইশত আবিষ্কারের প্যাটেন্ট নিতে পারিনি। আমাদেরকে টেকনোলজিতে ডেভেলপ করতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, শিশু–কিশোরদের কথা ভেবে নতুন কুঁড়ির সূচনা করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বর্তমানে তারেক রহমান শিশু–কিশোরদের জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তার কন্যা জাইমা রহমান বিজ্ঞান মেলা আয়োজন করছেন। মাইজভাণ্ডারী একাডেমি আজ ‘মাঘ উৎসব’ নামে দৃষ্টিনন্দন প্রকাশনা বের করেছে। আজকের শিশু–কিশোররা ঋতু সম্পর্কে জানে না। বাংলা মাসের নাম ও ষড়ঋতুর কথা কয়জনইবা জানে। মেয়র বলেন, শিশুদের শেখাতে হবে রাস্তাঘাটে নদী খালে নালায় ময়লা ফেলা যাবে না। আমি বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১১টি খেলার মাঠ করে দিয়েছি। পর্যায়ক্রমে ৪১টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ তৈরি করে দেবো। একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব ও দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, স্রষ্টার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে মানুষ। এই পৃথিবীতে যত জন্তু জানোয়ার আছে, সিংহ বাঘ ভাল্লুক বানর–এগুলি তারা যখন জন্মগ্রহণ করে তখন কিন্তু তারা তাদের প্রজাতি হয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু মানুষ হলো একমাত্র জীব যাকে কিন্তু শিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তাকে মানুষ হতে হয়। এটাই হল সবচেয়ে বড় জিনিস। মানুষকে মানুষ হতে হলে তাকে প্রথমে শিক্ষা নিতে হবে। তার মা–বাবা এবং শিক্ষক। আমি যেখানে যাই সেখানে একটা কথা বলি। সেটা হচ্ছে এই পৃথিবীতে তিনজন মাত্র লোক আছে। যারা তোমাদের শুধু ভালো চায় অন্য কিছু চায় না তারা হলো তোমাদের মা বাবা এবং শিক্ষক। সুতরাং শিক্ষককে যদি তোমরা সম্মান না দাও তাহলে কিন্তু তোমরা জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলবে। কুরআন মজিদের একটি আয়াত হচ্ছে ‘লাইসা লিল ইনসানা ইল্লা মা সাআ’ চেষ্টা সাধনা করলে মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। আমাকে অনেকে বলেন দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে। আমি বলি দেশটা নিয়ে ভাবনা বাদ দিয়ে আগে নিজের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনুন। আপনি ঠিকভাবে চললে দেশটাও ভালো হয়ে যাবে। খুব বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। তখন জীবনে দুঃখ–বিপর্যয় নেমে আসবে।
তিনি আরো বলেন, আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে রেখেছি। সেখান থেকে ১০ জনকে স্কলারশিপ দেওয়া হয়। আর যত অন্ধ ছেলে আছে তারা যে কেউ যদি লেখাপড়ায় থাকে এখান থেকে যদি কেউ আপনাদের কোনো জানাশোনা কেউ থাকে আমার কাছে পাঠাবেন। আমি তাকে প্রতি মাসে অনুদান দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করব। আপনারা হয়তো অনেকে জানেন না এই চট্টগ্রামে মা ও শিশু হাসপাতালে যে ক্যান্সার ইউনিট রয়েছে সেখানে আমি প্রায় ৪০ কোটি টাকা তুলে দিয়ে সেখানে ক্যান্সার ইনস্টিটিউট করতে সহায়তা করেছি। আমার মায়ের নামেও আমি একটা ক্যান্সার ইউনিট করে দিয়েছি। সেখানে আমি আমার পক্ষ থেকে এক কোটি টাকা দিয়েছি। এগুলো বলছি শুধু আমার জন্য নয়, আসলে অন্যজনকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। আপনারা এগিয়ে আসুন, আমরা যদি সকলে মিলে ছোট ছোট কাজ করি, তাহলে সেটা একদিন অনেক বড় কাজ হয়ে যায়।
শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণাধীন মাইজভাণ্ডারী একাডেমির ব্যবস্থাপনায় গতকাল সকালে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে শিশু–কিশোর সমাবেশের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়ক এইচ এম রাশেদ খান। বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী ও রাজনীতিবিদ ইসরাফিল খসরু। এছাড়া ট্রাস্টের ম্যানেজিং ট্রাস্টি সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারীর বাণী পাঠ করেন ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক এ ওয়াই এমডি জাফর। সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পিপি মফিজুল হক ভুইয়া, জিপি আবুল কাশেম চৌধুরী, অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. তৈয়ব চৌধুরী, রাজনীতিবিদ কাজী বেলাল, গবেষক মুহাম্মদ ওহিদুল আলম, সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ, কল্যাণী ঘোষ, আব্দুর রহিম, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শোয়েব উদ্দিন খান, রোটারিয়ান নাজমুল হাসান ও ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আবু নাসের নুর অন্তু প্রমুখ।
শিশু কিশোর সমাবেশে কুরআন তেলাওয়াত, না’তে রাসুল, মাইজভাণ্ডারী গান, দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়। এছাড়া দেলা ময়না বিজ্ঞান মেলা, শিশু পার্ক, খেলাঘর, পিঠা উৎসব, আলোকধারা বুকস, ট্রাফিক সচেতনতাসহ বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া দেলা ময়না বিজ্ঞান মেলার বিভিন্ন উদ্ভাবনা প্রজেক্ট উপস্থাপন করেন খুদে শিক্ষার্থীরা।












