একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি–সোপানে আরোহণ করে আমরা আজ এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছি, যেখানে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তারই তৈরি এক যন্ত্র। নাম তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)। এটি কেবল যান্ত্রিক কিছু সংকেতের সমাহার নয়, বরং মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে যান্ত্রিক অবয়বে রূপান্তরের এক অভাবনীয় ও সুসংগত প্রচেষ্টা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে মহাকাশের অসীম শূন্যতা–সর্বত্রই আজ এআই–এর জয়যাত্রা। তবে এই অতি–মানবিক ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধূসর দিকগুলো নিয়েও আজ ভাববার সময় এসেছে।
সহজ কথায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো কম্পিউটারের সেই সক্ষমতা যা তাকে মানুষের ন্যায় অনুধাবন করতে, শিখতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। প্রথাগত কম্পিউটার পোগ্রাম যেখানে আদিষ্ট নির্দেশনার বাইরে এক চুল নড়তে পারে না, সেখানে এআই বিপুল পরিমাণ তথ্যাবলি (Data) মন্থন করে নিজেই বিভিন্ন প্যাটার্ন বা শৈলী শনাক্ত করতে পারে। এটি মূলত মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়বিক প্রক্রিয়াকে অনুকরণের এক গাণিতিক ও যান্ত্রিক রূপান্তর।
এর কাজের মূল ভিত্তি হলো মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিং। প্রক্রিয়াটি তিনটি স্তরে বিন্যস্ত– প্রথমে বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে ডেটা সংগ্রহ, অতপর অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করা এবং পরিশেষে পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
এআই–এর প্রভাব আজ মানবজীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে বিদ্যমান। এর মাধ্যমে যেমন কার্যদক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসেছে বৈপ্লবিক বিবর্তন। বিশেষ করে ক্যান্সার শনাক্তকরণ বা ঔষধের জটিল রাসায়নিক সংমিশ্রণ তৈরিতে এআই এখন চিকিৎসকদের প্রধান সহযোগী। আবার অগ্নিনির্বাপণ বা খনি খননের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের পরিবর্তে রোবট ব্যবহার করে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হচ্ছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটি বেশ উদ্বেগজনক। এআই–এর এই জয়জয়কার অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হ্রাসের শঙ্কা জাগাচ্ছে। এছাড়া ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। যন্ত্রের মধ্যে যুক্তি থাকলেও সহমর্মিতা বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার অভাব থাকায় অনেক সময় এর সিদ্ধান্তগুলো রূঢ় ও যান্ত্রিক হয়ে ওঠে। মানুষের এই অতিরিক্ত যন্ত্র–নির্ভরতা কি আমাদের নিজস্ব সৃজনশীলতাকে অকেজো করে দিচ্ছে? প্রশ্নটি আজ অমূলক নয়।
এআই কোনো জাদুর কাঠি নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত দক্ষ কিন্তু অবুঝ সহকারীর মতো। একে দিয়ে সঠিক কাজ করিয়ে নেওয়ার শিল্পকে বলা হয় ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’। এখানে সফল হতে হলে আপনাকে নির্দেশনায় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হতে হবে। অস্পষ্টভাবে ‘একটি প্রবন্ধ লেখো’ না বলে তার প্রেক্ষাপট, শব্দসীমা এবং বাচনভঙ্গি স্পষ্ট করে দিলে ফলাফল অনেক বেশি উৎকর্ষমন্ডিত হয়।
যন্ত্রকে যখন আপনি একটি নির্দিষ্ট চরিত্র বা ‘রোল’ প্রদান করেন (যেমন: “তুমি একজন দক্ষ আইনজীবীর মতো এই চুক্তিটি বিশ্লেষণ করো”), তখন তার আউটপুট সাধারণ গন্ডি ছাড়িয়ে যায়। জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে নির্দেশনা প্রদান করলে এবং আউটপুট ফরম্যাট নির্দিষ্ট করে দিলে এআই–এর কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া সম্ভব।
অনেকের ভ্রান্ত ধারণা যে, এআই থাকলে হয়তো নিজের বুদ্ধিমত্তা খাটানোর প্রয়োজন নেই। বাস্তবতা হলো, আপনার নিজস্ব প্রাথমিক জ্ঞান না থাকলে এআই আপনাকে বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করতে পারে।
এআই যে বয়ান তৈরি করে, তা অনেক সময় যান্ত্রিক বা প্রাণহীন হয়। আপনার যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকে, তবে আপনি সেই খসড়ায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার রং মিশিয়ে তাকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন।
এআই মাঝে মাঝে অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ পরিবেশন করে। আপনার যদি মৌলিক ধারণা থাকে, তবেই আপনি সেই ভুলগুলো চিহ্নিত করে চূড়ান্ত কাজটিকে নির্ভরযাগ্য করতে পারবেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক সত্যতা বা জটিল যুক্তশব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এআই–এর ওপর অন্ধনির্ভরতা বিপজ্জনক। দক্ষ কারিগর যেমন জানেন ঠিক কোথায় ছেনি চালালে পাথর মূর্তিতে রূপান্তরিত হবে, তেমনি আপনার জ্ঞানই এআই–কে সঠিক পথে চালিত করবে। যার জ্ঞান নেই, তার প্রম্পট হবে অতি সাধারণ; কিন্তু একজন বোদ্ধার প্রম্পট হবে অত্যন্ত প্রখর ও প্রভাবশালী।
পরিশেষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো ভীতি নয়, বরং এটি মানুষের প্রজ্ঞার এক নতুন দিগন্ত। এটি আমাদের প্রতিস্থাপক নয়, বরং পরিপূরক। সেন্স অব হিউমার বা রসবোধ দিয়ে বললে–এআই হলো সেই আলাদিনের চেরাগ, যার দৈত্যটি খুব শক্তিশালী কিন্তু একটু বোকা। আপনি যদি সঠিক মন্ত্র বা প্রম্পট না জানেন, তবে সে আপনার পুরো ঘরটিকেই হয়তো উল্টে দেবে! তাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই প্রগতিশীল প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়া এবং একইসাথে নিজের মৌলিক জ্ঞানকে শাণিত রাখাই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।











