কলাবতী ফুল

নুশরাত রুমু | বুধবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ at ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ

বর্ষার কাদা ডিঙিয়ে স্কুলের পথে রওনা হলো পপি। গত কয়েকদিনে অবিরাম বৃষ্টিতে পথঘাট একেবারে কর্দমাক্ত। পপি পা টিপে টিপে চলছে। স্কুলটা বাজারের পাশে তাই রাস্তায় লোকজনের আনাগোনা বেশি। পপি ভয় পাচ্ছে যদি তার পা পিছলে সে পড়ে যায় তবে তো সবাই দেখে হাসবে। ইস্‌! কেন যে এই রাস্তাটা পাকা করে না। ভয়ে ভয়ে হেঁটে কোনোমতে সে স্কুলে পৌঁছাতে পারল। সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে দ্বিতীয় টেবিল খালি দেখল তবু সে সেখানে বসল না। কারণ পড়াশোনায় সে ততটা ভালো নয়। কিছু বললে সহজে তার মাথায় ঢোকে না। সামনে বসলেই টিচাররা বেশি প্রশ্ন করে। তাই সে পেছনে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হলো। আজকে স্যার বর্ষার ফুল নিয়ে পড়াচ্ছেন। সবাইকে একটা করে বর্ষাকালে ফোটে এমন ফুলের নাম জানতে চাইলেন । অনেকে অনেক ফুলের নাম বলল। ভেবেচিন্তে পপি বলল কলাবতী ফুলের নাম। ক্লাস শেষে স্যার বললেন, সবাই তো সব ফুল চেনো না। কাল তোমাদের বাড়িতে ফোটে এমন ফুল সবাই নিয়ে আসবে। তাহলে সবাই সব ফুল চিনে নেবে। পপি নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি গেল। তাদের বাড়িতে কত কলাগাছ! কলাবতী ফুল নেয়া কোনো ব্যাপারই না। ঘরে ঢুকতেই মা বলল, টেবিলের ওপর বাটিতে ডিম আছে। তোর চাচিকে ডিম দুটো দিয়ে আয়। সে বাটি থেকে ডিম নিয়ে চাচিদের ঘরে গেল। কিন্তু চাচি ঘরে নেই। সে জোরে ডাকতেই রান্নাঘর থেকে চাচি সাড়া দিল। ওহ্‌ রান্নাঘরে যাবার পথটায় এত কাদা। চাচি বটিতে পেঁয়াজ কাটছিলেন। পপি পেঁয়াজের ঝাঁঝ সহ্য করতে পারে না তাই দাঁড়িয়ে থেকেই চাচিকে ডিম দুটো ছুঁড়ে দিল। মুহূর্তেই ডিম মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। আরে কি করলি

তোর মা কেন যে তোর মতো বোকাকে এসব কাজে পাঠায়, চাচির বিরক্তি স্বরে পপি লজ্জা পেল। মনে মনে ভাবল কত সময় মাকে আলু, পেঁয়াজ এসবও ছুঁড়ে দিই। কই কখনো তো ভাঙেনি। ভয়ে সে আর কথা বলল না। আজ হয়ত কপালে মার আছে। ঘরে এসে পপি স্কুলের পোশাক বদলে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসল। কলাবতী ফুলের কথা মাকে বলবে ভেবেছিল কিন্তু ডিম ভাঙার ভয়ে চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল। যাক এতক্ষণে চাচি তো মাকে কিছু বলেনি। তাহলে হয়ত আর বলবে না।

পরদিন সে তার ছোট চাচাকে কলাবতী ফুল সংগ্রহ করে দিতে অনুরোধ করল। টিচার নিতে বলেছেন শুনে চাচা তা পেড়ে দিল। যথাসময়ে স্কুলে গিয়ে দেখল সবাই কত রকমের ফুল নিয়ে এসেছে। কদম, কেয়া, শাপলা, টগর, গন্ধরাজ, বেলী এমনকি কচুরিপানার ফুলও নিয়ে এসেছে তিনজন। পপি কাউকে তার আনা ফুল দেখাল না। সে ক্লাসে গিয়ে পেছনের বেঞ্চে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর স্যার ক্লাসে এলো। সবাই এক এক করে গিয়ে স্যারকে তাদের আনা ফুল দেখাল। স্যার পুরো ক্লাসের সবাইকে সে ফুলগুলো দেখিয়ে জোরে জোরে নাম বলতে লাগলেন। এবার পপির দেখানোর পালা। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। স্যার খুব আগ্রহ নিয়ে তাকে কলাবতী ফুল দেখাতে বললেন। পপি বিশাল এক বাজারের ব্যাগ থেকে আস্ত কলাসহ একটা কলার মোচা বের করলো।

স্যার হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেলেন, এই তোর কলাবতী ফুল! পুরো ক্লাসে হাসির রোল পড়ে গেল। কেউ আবার হাততালিও দিল। স্যার হাসতে হাসতে বললেন, এ জন্যই তোকে মাথামোটা বলি। পপি ভীষণ লজ্জা পেলো। স্যার তাকে কাছে ডেকে বুঝিয়ে দিলেন। শোন্‌ লজ্জা করিস না। কোনো কিছু না বুঝলে আবার প্রশ্ন করে বুঝে নিবি। জানার জন্যই তো স্কুলে আসা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅতি লোভের ফল
পরবর্তী নিবন্ধবেতের বনে ডাহুকের বাসা