মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমে যাচ্ছে। এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বে ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এসব তথ্য জানিয়েছে। ইউনিসেফ ‘দ্য ইম্প্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মনিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, এ সংকট বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতিকে ম্লান করে দিতে পারে। পাশাপাশি লাখ লাখ শিশুকে আরো গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে এবং বৈষম্য বাড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে দেশটিতে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে।
ইউনিসেফ তাদের প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেছে–বিরূপ ও তীব্র দারিদ্র্য। বিরূপ পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয়ে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু তীব্র অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতির সঙ্গে শিশুদের অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হওয়ার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, অর্থনৈতিক দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকায়। বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক দারিদ্র্যর প্রায় ৮০ শতাংশই হবে এ দুই অঞ্চলে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ সংকট শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইউনিসেফ শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার, দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের আয় থেকে ব্যয় বেড়েছে। মানুষের আয়ের ৫৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয় খাদ্য কিনতে, চিকিৎসায় ৮ শতাংশ, শিক্ষায় ৮ শতাংশ, যাতায়াতে ৭ শতাংশ এবং পরিষেবায় ৪ শতাংশ। মৌলিক চাহিদা মেটাতে মানুষকে হিমশিম খেতে হয়েছে। দুঃখজনক যে, ২০২২–২৩, ২০২৩–২৪ এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কর্মসংস্থান বাড়েনি। অনেক স্নাতক ডিগ্রিধারী কাজ পাচ্ছে না। বর্তমানে ৯ লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য রেখা দিয়ে দরিদ্র মানুষ চিহ্নিত করা হয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুসারে দিনে ২ দশমিক ১৫ ডলার আয় করে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার সামর্থ্য না থাকলে অতি দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে প্রতিটি দেশের জন্য নিজস্ব একটা দারিদ্র্য রেখা ঠিক করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্য সীমার মানদণ্ড হলো খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা ক্রয় করার জন্য একজন মানুষের প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা ব্যয় করার সামর্থ্য না থাকলে তিনি দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যাবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি বহিরাগত সংকট হলেও এর প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতা নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর। তাই এখনই সময় দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারে মনোযোগ দেওয়ার। তা না হলে দারিদ্র্যের যে অন্ধকার ছায়া আবার ঘনিয়ে আসছে, তা আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হতে পারে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি ঠেকাতে পদক্ষেপ গ্রহণ হবে। তদুপরি সামাজিক সুরক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা–ও সব সময় উপযুক্ত ব্যক্তি পান না। স্বার্থান্বেষী মহল হাতিয়ে নেয়। এ অবস্থায় সরকার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, যাতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা যাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দেশের শ্রমবাজারের পাশাপাশি বিদেশের শ্রমবাজার সমপ্রসারিত করতে হবে।







