কক্সবাজারে পাহাড় ধসে নিহত ১০

উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরে মারা গেছে ৮ জন, অপর দুইজন কক্সবাজার শহর এবং পেকুয়ার

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ৭ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

প্রবল বর্ষণে কয়েকটি পাহাড়ধসের ঘটনায় উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। গত রোববার রাত থেকে গতকাল সোমবার ভোর পর্যন্ত উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের চারটি স্থানে, কক্সবাজার শহরের সাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের এসব ঘটনা ঘটে। এছাড়া গতকাল বিকালে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নে টানা বর্ষণের মধ্যে পাহাড় ধসের ঘটনায় মিনহাজ () নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় ৮ রোহিঙ্গা নারীশিশু সহ ৯ জন নিহত হয়েছে। গত রোববার দিবাগত রাতে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের তিনটি ও কক্সবাজার শহরে একটি সহ পৃথক চার এলাকায় এসব পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, রোববার দিবাগত রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নং জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে আশ্রিত রোহিঙ্গা মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের (৪৪) বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এ ঘটনায় কামাল হোসাইন ও তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং পুত্র মোহাম্মদ আনাসের () মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালায়, ৩ জনকে মৃত ও ২ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

এছাড়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে রাত ১টা ৪৫ এর দিকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটি চাপায় একরাম নামে ৭ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত একরাম ঐ ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।

ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, খবর পেয়ে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। একই রাত ৩টার দিকে ক্যাম্প প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উখিয়া উপজেলার বালুখালী ১১ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড় ধসে নারী ও শিশু সহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, এছাড়াও আহত হয়েছেন ১ জন। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন ঐ ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রশিদের ছেলে মোহাম্মদ রিহান () ও তার ভাই হারুনুর রশিদ ()

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নং ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে আলী আকবর নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোর ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পাহাড় ধসে চাপা পড়ে একই পরিবারের ৩ জন। স্থানীয়রা ৩ জনকে উদ্ধার করে। এ সময় আলী আকবরের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে আসা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পেকুয়া : পেকুয়া প্রতিনিধি জানান, উপজেলার টইটং ইউনিয়নে পাহাড় ধসে মিনহাজ () নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় জান্নাতুল ফেরদৌস (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা গুরুতর আহত হয়েছেন। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার টইটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খুন্যাভিটার আলিম্মার ঝিরি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ‎নিহত মিনহাজ ওই এলাকার বাসিন্দা কলিম উল্লাহর ছেলে। আহত জান্নাতুল ফেরদৌস একই এলাকার মৃত ছাবের আহমদের স্ত্রী এবং নিহত শিশুটির নানি। ‎স্থানীয় ইউপি সদস্য মঞ্জুর আলম জানান, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে পড়েছিল। বিকেলে পাহাড়ের ঢাল থেকে একটি বড় গাছ ভেঙে তাদের বসতঘরের ওপর পড়ে। পরে জান্নাতুল ফেরদৌস তার নাতি মিনহাজকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের ওপর পড়ে থাকা গাছের ডালপালা সরানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে তাদের ওপর এসে পড়ে। এতে দুজনই মাটিচাপা পড়েন। ‎পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে গুরুতর আহত অবস্থায় জান্নাতুল ফেরদৌসকে উদ্ধার করেন। তবে মিনহাজ মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, পাহাড় ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা কিংবা খাড়া ঢালে নির্মিত বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টানা বর্ষণে মাটি নরম হয়ে গেলে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পাহাড়ের অংশ, আর ঘুমন্ত মানুষের জন্য তা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী ফাঁদ।

এছাড়া উখিয়া ও টেকনাফে যেসব শরণার্থী ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বসবাস করছে তার মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় পাহাড়ের মাটি কেটে গর্ত তৈরি করে তার মধ্যে ঘর বানানোর কারণে ভূমিধস কিংবা পাহাড়ধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন, শরণার্থী শিবিরগুলোর যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেসব জায়গা থেকে আগেও রোহিঙ্গাদের সরানো হয়েছিল। কিন্তু নতুন আসা রোহিঙ্গারা আবার এসব জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় স্থানীয়রা পাহাড়ের মাটি কেটে ঘর বানিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাড়া দিয়েছে। আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে গত কয়েকদিন ধরে সতর্ক করেছি। রাতে ব্যাপক ভারী বৃষ্টি হয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি আরও অন্তত দুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতালিকা ৩ বছর আগের, নেই অভিযান
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬