নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে একটি জীবন্ত দলিল, ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে উচ্চকিত একটি কন্ঠ, জুলুমের বিরুদ্ধে ইনসাফের আলোকবর্তিকা। মানবিক সমাজ ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক অগ্রজ সেনানীর কন্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর কোনদিন ফিরবে না একজন শরীফ ওসমান হাদি। আকাশ বাতাস মাড়িয়ে তোলপাড় করে তুলবে না হাদির বজ্রকন্ঠ–যার চোখের মাঝে রয়েছে জুলুমবাজের বিরুদ্ধে শাণিত রক্তাক্ত অধ্যায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর থেকেই গর্জে ওঠেছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। ১৬ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসেনানী ছিলেন এই শরীফ ওসমান হাদি। ভারতীয় মদদপুষ্ট এই দেশের দোসর ও ফ্যাসিস্ট খুনী হাসিনার সন্ত্রাসীরা ১২ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে দিবালোকে খুব কাছ থেকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলিবিদ্ধ করেছে বাংলার দুর্দমনীয় বাঘ হিসাবে পরিচিত শরীফ ওসমান হাদিকে। একটি স্বপ্ন, একটি গণচেতনা, একটি ইতিহাস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল নিমিষেই। জীবনকে বাজি রেখে লাখো মানুষের মিছিলে অংশ নেওয়া বত্রিশ বছর বয়সের টগবগে এই যুবক আর কোনদিন ফিরবে না এই তল্লাটে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি মহান আল্লাহতায়ালার মেহমান হয়েছেন ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের তোমরা কোন অবস্থাতেই মৃত মনে করো না, তারা তো জীবিত, তাদের মালিকের কাছ থেকে রেজেক দেওয়া হচ্ছে’ (সূরা ইমরান–১৬৯)। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহতায়ালার পথে নিহত হয়েছে তাদের তোমরা মৃত বলো না: বরং তারাই হচ্ছে জীবিত কিন্ত এই ব্যাপারে তোমরা কোন চৈতন্যই রাখ না’ (সূরা বাকারা– ১৫৪)। আজ এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আসল আসামী ফয়সাল করিম মাসুদকে ধরতে পারেনি পুলিশ। হাদি হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল ও (২৬ ডিসেম্বর) থেকেই উত্তাল রাজধানীর শাহবাগ চত্বর। হাজার হাজার শোকাতুর জনতা ইনকিলাব মঞ্চের এই অবরোধে অংশ নিয়েছে। তাদের একটাই দাবী: হাদী হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না। শুধু ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এই অবরোধে অংশ নিয়েছেন। রাজধানীর শাহবাগ যেন এক উত্তপ্ত কড়াই। আন্দোলনরত প্রতিটি মানুষের চোখে যেন দ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। ভারতীয় দাসত্বের বিরুদ্ধে তারা গর্জে উঠেছে বার বার। আজ বাংলার প্রতিটি ঘর যেন হাদীর প্রতিচ্ছবি। শহীদ শরিফ ওসমান হাদির প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে চলছে বিক্ষোভ আর রাত যাপন। হাজার হাজার নারী পুরুষ কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তুলছে এই চত্বর। রাতের নিঃশব্দতা ভেদ করে আকাশে ভেসে আসে হাদির খুনিদের বিচারের শব্দ–সংবাদ। ভেসে আসে হাদির সেই ঐতিহাসিক স্লোগান, ‘জান দেব জুলাই দেব না’। হাদির সারথিদের বজ্রকন্ঠের দৃপ্ত ঘোষণা, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’, ‘আপোষ না বিপ্লব, বিপ্লব, বিপ্লব’, ‘যেই হাদি জনতার, সেই হাদি মরে না’। বিক্ষোভকারীরা কাল্চারাল ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে উত্তাল স্লোগান তুলে। এই ফ্যাসিস্টরাই নাট্যমঞ্চে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে একের পর এক কর্মকান্ড চালিয়ে যায়। ওসমান হাদি ছিল কাল্চারাল ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর দ্রোহের আগুন। ন্যায় বিচারের জন্য লড়ে যাচ্ছে হাদির সঙ্গী সাথীরা এখনো। ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং তাদের এই দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে ওসমান হাদি ছিল এক অকুতোভয় আপসহীন সংগ্রামের কান্ডারী। হাদির উজ্জ্বল অবদান আগামী তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি বেগবান করবে–তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যারা ৫৪ বছর ধরে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে একাট্টা ছিলেন এই ওসমান হাদি। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্যে যে কয়জন কান্ডারী বিপ্লবের অগ্রভাগে ছিলেন তার মধ্যে ওসমান হাদি অন্যতম। তার মনন ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক দুরন্ত অভিযাত্রী। এদেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে ২৪ এর জুলাই–এ সারা দেশে যে তারুণ্যের জোয়ার উঠেছে, তাকে এগিয়ে নিতে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন এই তূর্কি সংগ্রামী। ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করে তোলার যে অভিপ্রায় হাদির মাঝে জন্মেছিল, তা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের প্রেতাত্নারা অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দিল। নয়া বন্দোবস্তের এই জামানায় একজন অগ্রনায়ককে হারালো এই প্রিয় বাংলাদেশ। পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙ্গে চুরমার করে এক নয়া জামানার দিগন্ত উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন এই তরুণ প্রজন্মের কান্ডারী। ইতিহাস কখনো এই খুনিদের ক্ষমা করবে না। ওসমান হাদি বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙ্গালির হৃদয় তল্লাটে। আর খুনিরা নিক্ষিপ্ত হবে ইতিহাসের আস্তাখুঁড়ে। হাদির শব্দ চয়নে ছিল অসম্ভব বাগ্মিতা, তার কন্ঠে ছিল বজ্রপাতের কঠোর অভিবাসন। তার মাঝে ছিল পুরোনো রাষ্ট্র কাঠামো ভাঙ্গার দৃপ্ত সাহসী উচ্চারণ।
৩২ বছরের এই তরুণ টগবগে যৌবন ছিল অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষের চিন্তার প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দুর্বার আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি। বিশেষ করে কাল্চারাল ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার, উচ্চকিত কন্ঠ। যে ফ্যাসিবাদ বাংলার ইতিহাস, শিক্ষা, সমাজের ভিতর ঢুকে দূর্বিসহ করে তুলেছিল–সে দুর্নীতি ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পিছনে ছিল হাদির সাহসী কণ্ঠস্বর। ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পেছনের মূল কারণই ছিল ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার। বিদেশী দাসত্বের বিরুদ্ধে একা লড়াই চালিয়ে গেছেন ওসমান হাদি। ওসমান হাদির মাঝে ছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতার উত্তম পরাকাষ্ঠা। শাহাদাতের তামান্না ছিল ওসমান হাদির অন্যতম অঙ্গীকার। ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার এই জীবন যুদ্ধে যদি শহীদ হয়ে যায় তবু তার মনে ছিল না কোন বেদনা, কোন অনুশোচনা আর সেটা করে দেখিয়ে দিয়েছে এই তরুণ প্রজন্মের অহংকার। নিজের জীবন দিয়ে জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে জীবন দিতে হয়। এই ধরনের কমিটমেন্ট ছিল হাদির জীবনের পরম পাওয়া। ঢাকা ৮ আসনের জনপ্রতিনিধি হতে চেয়েছিলেন ওসমান হাদি কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরতে তিনি হয়েছেন কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা, ইতিহাসের এক উজ্জল অধ্যায় আর গ্রহণ করলেন শাহাদাতের এক সুমহান মর্যাদা। জান্নাতের বাগানে এখনো যেন ছুটাছুটি করছে সবুজ পাখি হয়ে। হাদির প্রস্থান যেন বাংলাদেশের কঠিন অভিধান। তার রেখে যাওয়া আদর্শ বাংলার নতুন প্রজন্মকে পথের দিশা দেখাবে।
লেখক: সভাপতি–রাউজান ক্লাব, সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি);
রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল











