চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে কাতার ও ওমান থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে ৪৩টি এলএনজি কার্গো। গ্যাসের চাহিদা স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মাসে প্রয়োজন ৯ থেকে ১০টি এলএনজি কার্গো। অথচ গত আগস্ট মাসে এসেছে মাত্র ছয়টি। যার প্রভাব বেশি পড়েছে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে। কারণ চট্টগ্রাম অঞ্চল পুরোটাই এলএনজি নির্ভর।
‘নগরে গ্যাস সংকটের কারণ, সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ’ নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য মো. এরশাদ উল্লাহর এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে পাঁচলাইশস্থ বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ সভায় বাখেন কেজিডিসিএল–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন।
সভায় জানানো হয়, গ্যাস সরবরাহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পেট্রোবাংলা নিয়মিতভাবে বিতরণ কোম্পানিসমূহের বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য গ্যাস বরাদ্দ প্রদান করে। বর্তমানে কেজিডিসিএল এর অধিভূক্ত এলাকায় ৩০০–৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দৈনিক ২৪৫–২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রাহক প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে। সভায় দেশিয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন গ্যাস কূপ খনন, মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কেজিডিসিএল এর চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন ভাবে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে বলেও আশ্বস্ত করা হয়।
যা বললেন এরশাদ উল্লাহ : এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, গত ১৫ বছরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। সমুদ্রসীমা বিজয়ের পরও বঙ্গোপসাগরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও অফশোর ড্রিলিং হয়নি। ফলে নিজেদের গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিবর্তে এলএনজি নির্ভরতা বেড়েছে। তিনি বলেন, গ্যাসের বিষয়টি অনেকটা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো। জাতীয় পর্যায়ে যত গ্যাস পাওয়া যায়, সেখান থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। একসময় চট্টগ্রামের কাছাকাছি ও দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরাসরি গ্যাস আসত। এখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
এরশাদ উল্লাহ বলেন, মহেশখালীতে এঙিলারেট পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই আগুনের ঘটনা ঘটে। তখন চট্টগ্রামে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছিল। ওই সময় অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র এক–দুই ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেছে। সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার পরই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে দুটি সংকটের প্রভাব একসঙ্গে পড়েছে চট্টগ্রামের ওপর।
এরশাদ উল্লাহ বলেন, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি আরও এলএনজি টার্মিনাল প্রয়োজন। গত ১৫ বছরে গ্যাসকূপ খননে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করা জরুরি। সাময়িক সংকট কাটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এরশাদ উল্লাহ বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ১৪ ডলারে কেনা হলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২৭ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। এরপরও সরকার গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে জনগণকে সেবা দিতে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। সরকার ভর্তুকি দিয়েও জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য কর্মপরিকল্পনা ও কার্যক্রম করে যাচ্ছে। এটা সরকারের জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব সরকার পালন করছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সংকটের মধ্যেও সরকার জনগণের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপিয়ে না দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় যে পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করেন তিনি। গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামবাসীর করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে এমপি এরশাদ উল্লাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই অস্বাভাবিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ফল। যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীর সংকট এবং এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, গ্যাস না থাকায় তাকেও বাসায় সিলিন্ডার ব্যবহার করে রান্না করতে হয়েছে। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ যে কষ্ট পাচ্ছেন, তিনিও সেই বাস্তবতার বাইরে নন।
এরশাদ উল্লাহ চট্টগ্রামবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার সংকট সমাধানে কাজ করছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এসময় কেজিডিসিএল–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন বলেন, আগে সিলেট, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডসহ দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্যাস আসত। কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দেশীয় গ্যাসও চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। বিপরীতে শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। দেশীয় উৎপাদন সেই হারে না বাড়ায় ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।
ঘাটতি কত? প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন জানান, দেশে দৈনিক গ্যাস চাহিদার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, এ চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে দেশিয় উৎস থেকে গ্যাস দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া এলএনজি আমদানি করা হয় প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদার সাথে গ্যাস উৎপাদনের কিছুটা ঘাটতি আছে। প্রতি মাসে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহের জন্য ৯ থেকে ১০টি কার্গো আমদানি করতে হয়। গত মাসে এসেছে ছয়টি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বর্তমানে প্রায় পুরোপুরি এলএনজি নির্ভর। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করা হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে সৃষ্ট সংকটে এসব কার্গোর সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। কেজিডিসিএল এমডি দাবি করেন, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপজনিত সমস্যা তুলনামূলক কম। তিতাস অঞ্চলের মতো ব্যাপক চাপ সংকট চট্টগ্রামে নেই। বর্তমান সমস্যা মূলত গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ ও বরাদ্দ ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকারের যত উদ্যোগ : সভায় জানানো হয়, গ্যাসের চাহিদা পূরণে সরকারের নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে দেশে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা আছে। ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপ খনন করা হয়েছে এবং উৎপাদিত গ্যাস জাতীয় গ্যাস গ্রীডে যুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ৭টি কূপ খননের কাজ চলমান আছে, খনন শেষ হলে আরো ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
এছাড়া মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে নেগোশিয়েশনের কাজ চলমান আছে, যেটা সমাপ্ত হলে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এছাড়া গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার টু–ডি সাইসমিক সার্ভে এবং প্রায় ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার থ্রি–ডি সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে।
যা বললেন কেজিডিসিএল–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক : কেজিডিসিএল–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন বলেন, চলতি মাসে প্রায় ২৩৫ এমএমসিএফডি গ্যাস বরাদ্দ দিয়েছে পেট্রোবাংলা থেকে। তার বিপরীতে ২৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস আমি চট্টগ্রাম শহর এলাকায় সরবরাহ করছি। বরাদ্দকৃত গ্যাসের সুষ্ঠু সরবরাহ করে এবং সিস্টেম লস সহনীয় মাত্রায় রেখে গ্যাস সরবরাহ করা আমার দায়িত্ব এবং বকেয়া আদায়ের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেজিডিসিএলের বরাদ্দ বাড়ানো গেলে বর্তমান সংকটের বড় অংশেরই সমাধান হবে। তবে বরাদ্দ বাড়াতে হলে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কেজিডিসিএল এর চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন ভাবে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে। তিনি বলেন, সিস্টেম লস কমানোর জন্য ১৬টি বিজিলেন্স টিম এবং ৫টি স্পেশাল বিজিলেন্স টিম গঠন করেছি। তারা প্রতিনিয়ত ফিল্ড ভিজিট করছে। এতে কেজিডিসিএল– এর সিস্টেম লস ২ শতাংশ এর নিচে চলে আসছে।
সভায় জানানো হয়, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) প্রায় ৫০ এমএমসিএফডি, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া বেসরকারি সিএনজি স্টেশনগুলোতে প্রায় ১৭ এমএমসিএফডি, আবাসিক খাতে ৩০ থেকে ৩৫ এমএমসিএফডি এবং বাণিজ্যিক খাতে প্রায় ৩ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এসময় উপস্থিত ছিলেন কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) রইস উদ্দিন আহমেদ, উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং) অনুপম দত্ত, ম্যানেজার (মার্কেটিং) মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজিম উদ্দিন।











