স্টীফেন হকিং এর সোজা ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, শতাব্দী ব্যবধানে মানব জাতিকে ভিনগ্রহে বসতি গড়তেই হবে। স্পেস এক্সের মালিক ইলন মাক্স বলছেন এই শতাব্দীর প্রথমার্ধে মঙ্গলে মানুষ পাঠাবেন। ব্লু অরিজিনের মালিক মার্ক বেজোস শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন ২০৪০ সালের মধ্যে মানুষ অবশ্যই মঙ্গলে পদার্পণ করবেই। সোজা কথা হলো সৌরজগতে পৃথিবীর নিকট গ্রহ বুধ বা শুক্র বা উপগ্রহ চাঁদে পানি না থাকায় মনুষ্য বসতি সম্ভব নয়। তবে একটু দূরের মঙ্গল গ্রহে সম্ভব, কারণ মঙ্গলে একসময় জল ছিল, জলাশয় ছিল, খাল, নদী ছিল। এখনো মাটির নিচে পানির ভাণ্ডার আছে। যেমন পৃথিবীর ভূ–পৃষ্ঠের নিচে পানি আছে। সোজা কথায় মঙ্গলে বেঁচে থাকার জন্য পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে মনুষ্য বসতি সম্ভব। মঙ্গলে বাতাস আছে তবে তা পৃথিবীর চেয়ে হালকা। মেরু অঞ্চলে জমাট বরফও আছে।
বৈরী হল গ্রহটি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মাইনাস ২০০ (বিশ ডিগ্রির) নিচে তাপমাত্রা। পৃষ্ঠে আয়রন অক্সাইড বেশি থাকায় পৃথিবীর অর্ধেক আয়তনের গ্রহটি পুরোপুরি লালচে। ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিটে ১ দিন ও ৬৮৭ দিনে ১ বছর। মানুষের বাস উপযোগী করতে হলে বাতাসের পরিমাণ ও বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতেই হবে। তার উপর নিশ্চিৎ করতে হবে বৃষ্টিপাত। ইলন মাক্সের বক্তব্য, নিউক্লিয়ার চার্জ করে কয়েক বছরের জন্য মঙ্গলকে ধুলায় ঢেকে দেয়া হবে মঙ্গলের আকাশ। ধুলার আবরণে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়লে মরুর বরফ গলে মেঘ সৃষ্টি হবে। কয়েক দশকের ব্যবধানে ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত বাড়বে। একাধিক ঋতুর আবির্ভাব হতে বাধ্য।
মঙ্গলে বসতি স্থাপনের প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা হলো চুম্বক ক্ষেত্রের অভাব। কোটি কোটি বছর আগে থেকে গ্রহটির ভূ–অভ্যন্তরে মিথস্ক্রিয়া ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে পড়ায় ও পৃষ্ঠদেশ থেকে মেঘ বৃষ্টির ঋতু চক্র হারিয়ে যাওয়ায়, গ্রহটি চুম্বকত্বহীন হয়ে পড়েছে। সৌর তাপ ও আলোর ক্ষতিকর বিকিরণ ঊর্ধ্বাকাশে আটকানোর একমাত্র প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হলো বায়ুমণ্ডলের চুম্বকক্ষেত্র। সৌর ও মহাকাশের বহু ক্ষতিকর পদার্থ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উর্ধাকাশে ঠেকিয়ে দেয় বলে আমরা ভূ–পৃষ্ঠে বেঁচে আছি। মঙ্গলে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল, একাধিক ঋতু ও চৌম্বক ক্ষেত্র ন্যূনতম ভারসাম্যে আসলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলা সম্ভব। শত শত বছরের ব্যবধানে গ্রীন হাউস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রবিশষ্য উৎপাদন হবে। কৃত্রিম জলপ্রবাহে চাষ হবে। প্রথম দিকে অক্সিজেন আটকে রেখে হয়তো ঘরে থাকতে হবে। বাড়ি থেকে বের হলেই হয়তো পিঠে অক্সিজেন সিলিণ্ডার নিয়ে বের হতে হবে– এই যা। আরো কতো প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে। আবার এসব অতিক্রমও করা যাবে। লাগুক না এর জন্য দশকের পর দশক বা শত শত বছর। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনস্থ নাসা মিউজিয়ামে মোটামুটি ১ বেলা ঘুরেছিলাম। তৃতীয় তলায় মঙ্গলে পাঠানো ল্যাণ্ডার পারসিভিয়ারেন্স এর প্রাথমিক টেস্টিং মেশিনটি ডিসপ্লেতে দেখে পুলকিত হলাম। পৃথিবীতে পরীক্ষা চালানো হয়েছে এটি দিয়ে। অত:পর হুবহু আরেকটি এখন মঙ্গলে। দিন রাত ব্যস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।
ষাটের দশক থেকে মঙ্গলের প্রতি মানুষের অব্যাহত অভিযান মনুষ্য ল্যাণ্ডিং করার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চলেছে। দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে মঙ্গলে ৩ ধরনের যন্ত্রদানব পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের ব্যর্থতার পর ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সোভিয়েত মঙ্গলযান ‘মার্স–৩’ মঙ্গলে ল্যাণ্ড করে। এরপর থেকে চাঁদে ল্যাণ্ড করেছে রুশ (রসকসমস) আমেরিকান (NASA), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA), চীনের মহাকাশ সংস্থা CNSA), ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার (ISRO) একাধিক ল্যাণ্ডার। প্রথম অভিযানেই ল্যাণ্ডিং করে চমক দেখিয়েছে ভারতের ইসরো। ল্যাণ্ডারের পেটের ভেতর থেকে যে যন্ত্রটি বেরিয়ে এসে আশে পাশে রাজার হালে হেলে দুলে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়, সেটির নাম রোভার। ইসরোর রোভার, রসকসমসের রোভার, চীনের রোভার ‘তিয়ানওয়েন– ১’ এটি ল্যান্ড ‘ঝুরুং’ এর পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে মে ২০২১ থেকে চালিয়ে যাচ্ছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ইউরোপীয় অর্থাৎ ESA এর রোভার বর্তমানে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দিয়ে মঙ্গলে মনুষ্য বসতি গড়ে তোলার করণীয় নিয়ে গভীর পরীক্ষা নিরীক্ষায় ব্যস্ত।
বিশ্ববাসীর জন্য সুখবর আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘অ্যানাবেনা’ ও ‘নস্টক’ নামক অনুজীব বা ব্যাকটেরিয়াকে মঙ্গলে ছেড়ে দেয়া গেলে সময়ের ব্যবধানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মতো ভারসাম্যপূর্ণ অক্সিজেনে ভরপুর হবে। নাসা আরো এককাঠি সরস হাওয়াই দ্বীপে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি ভূ–খণ্ডে ১টি বাড়ি তৈরী করা হয়েছে। চতুর্দিকে মনুষ্যহীন এই বাড়িতে একাকী থাকবেন ৬ নভোচারী। মূলত ৬ জন মানুষ একসাথে একটি ঘরে বহির্জগতের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকলে কিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় তার পরীক্ষা চলছে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী শীঘ্রই একাধিক মনুষ্যবিহীন অরবিটার পাঠানো হবে। মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবে ‘স্পেস এক্সের’ হ্যাংগারে। আবার ঐ রকেটে করে মনুষ্যবাহী অরবিটার পাঠানো হবে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করার জন্য। এরপর শুরু হবে নভোচারীদের মঙ্গলে ল্যাণ্ডিং করানোর চুড়ান্ত পর্ব।
দীর্ঘ ৭ মাসের মঙ্গল যাত্রার জন্য নাসা পথিমধ্যে অর্থাৎ কক্ষপথে ‘ল্যাগরেঞ্চ–২’ পয়েন্টে যাত্রাবিরতি দিতে চায়। যদি যাত্রাপথ ৪ মাসে নামিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হয় তবে বিশ্রাম না দিয়েও সরাসরি মঙ্গলে ল্যাণ্ডিং এর চিন্তা প্রাধান্য পাবে। কারণ এক্ষেত্রে আসা যাওয়ায় লাগবে মাত্র ৮ মাস।
অবশ্য রাশিয়ার প্লাজমা জ্বালানীর রকেট পাঠানোর ঘোষণা যদি সত্যি সফল হয় তবে মঙ্গলে মানুষ হাঁটবে, খেলবে, চাষ করবে, বাজার করবে, হোক না তা দু’প্রজন্ম পর। ‘রসকসমসের’ বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাজমা প্রযুক্তির রকেটের গতি এতোদিনকার জ্বালানীর সমস্ত সক্ষমতা অতিক্রম করবে। প্লাজমা জ্বালানী দিয়ে রকেট স্টার্ট দেয়ার ১ মাসের মধ্যে পৌঁছে যাবে মঙ্গলে। বিশ্ববাসী রইলো সেই শুভদিনের প্রত্যাশায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক; আইনজীবী, আপীল বিভাগ, প্রাবন্ধিক।














