চট্টগ্রাম মহানগরীর আবাসন, পর্যটন, যান চলাচল, জীবনমান উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে একসাথে ১০টি প্রকল্প গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–সিডিএ। ইতোমধ্যে প্রকল্পের সারপত্র তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পগুলো অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামের অনেক সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি নগরজীবনের উন্নয়ন ভিন্নমাত্রা পাবে।
সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পগুলোর মধ্যে নগরীর ‘মধ্যম হালিশহর থেকে ফৌজদারহাট জংশন পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ এবং পার্কিং এরিয়া উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় সিডিএ কর্তৃক ইতোমধ্যে নির্মিত চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোডের সাথে ১০.৬৯ কিলোমিটার (কিমি) ৪ লেনের বাঁধ–কাম সড়ক নির্মাণ, ৫.৬ কিমি ৪ লেনের সংযোগ সড়ক–কাম রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৬ কিমি ২ লেনের সার্ভিস সড়ক–কাম রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ০.৯৯ কিমি ঢেউ প্রতিরোধক রিটেইনিং ওয়াল–কাম বাঁধ নির্মাণ, ০.৫৬ কিমি ২ লেনের উড়াল সেতু নির্মাণ, পার্কিং এলাকা উন্নয়ন ৯৯২৫৭ বর্গমিটার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ৭০০ দোকান মালিককে পুনর্বাসনে ৩ তলা মার্কেট নির্মাণ, ১ হাজার ৫৫০টি সড়কবাতি স্থাপন, ৬ হাজার ২৩৭.৩৬ বর্গমিটার ক্রিকেট একাডেমি ভবন নির্মাণ, ৭টি রেগুলেটর নির্মাণ, ৩টি ৪ লেনের ২–স্প্যান ব্রিজ নির্মাণ এবং ৯টি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে চট্টগ্রাম শহর, চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকাসমূহ, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কলকারখানা ও স্থাপনা রক্ষা কার্যক্রম সহজ হবে। শহর ও উপকূলীয় বাঁধের মধ্যস্থিত এলাকাসমূহের উন্নয়নের মাধ্যমে আবাসন, বাণিজ্য, পর্যটন শিল্পকে উৎসাহিত করা এবং যাতায়াত সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সড়ক–কাম বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা–চট্টগ্রাম, কর্ণফুলী টানেল–কক্সবাজার এবং মীরসরাই ইকোনমিক জোন থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সংযোগ স্থাপন, সার্ভিস রোড নির্মাণের মাধ্যমে যাতায়াতের সুবিধা বৃদ্ধি করে নগরীর যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের যাচাই কমিটির সভায় উপস্থাপনের পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ‘চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড (২য় পর্যায়)’ নামে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
অপরদিকে নর্থ সাউথ–১ নামে বায়েজিদ লিংক রোড থেকে আমবাগান রোড পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের অপর একটি প্রকল্পও মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। শহরের উত্তর–দক্ষিণ দিক বরাবর সংযোগ সড়ক অপ্রতুল হওয়ায় শহরের বিস্তৃত এলাকার জনগণ যাতায়াতে নানা সীমাবদ্ধতা মোকাবেলা করছে। এই অবস্থার অবসানে সিডিএ নর্থ সাউথ–১ প্রকল্পের আওতায় বায়েজিদ বোস্তামী লিংক রোড থেকে আমবাগান রোড পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। নর্থ সাউথ–১ বাস্তবায়িত হলে উক্ত সড়কদ্বয়ের পাশে বিস্তৃত এলাকায় যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত হবে এবং নগরায়ন সম্প্রসারিত হবে। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে যাচাই–বাছাই সম্পন্ন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রকল্পটি আরএডিপিতে সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সিডিএ জঙ্গল সলিমপুরের পুনরুদ্ধারকৃত ৩ হাজার ১শ একর জমির পরিবেশভিত্তিক উন্নয়নের জন্য মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এই বিপুল খাস জমির সার্বিক উন্নয়নের জন্য মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন, সার্ভে, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ফিজিবিলিটি স্টাডি কার্যক্রম এই প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বিভাগে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পটিও আরএডিপিতে সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নগরীর অন্যতম ব্যস্ত সড়ক হিসেবে চিহ্নিত মেহেদীবাগ সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শহরের ইনার সার্কুলার রোডের মধ্যবর্তী এলাকার সংকীর্ণ এই সড়কটি সম্প্রসারণের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শহরের মধ্যবর্তী এলাকা থেকে উত্তর ও দক্ষিণমুখী যাতায়াত সুগম এবং যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এই প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চায় সিডিএ। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করে তৈরি করা ডিপিপি ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের যাচাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থায়নের ধরন নির্ধারণের জন্য প্রকল্পটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই প্র্রকল্পের আওতায় ১.৩১৩ কিমি দৈর্ঘ্য এবং ১৭ হাজার ৭২৫ বর্গমিটার রাস্তা সম্প্রসারণ করা হবে।
সিডিএ ফিরিঙ্গিবাজার রোড ও সদরঘাট রোড সংযোগের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে সদরঘাট ও বন্দরের যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন (ফিরিঙ্গিবাজার মোড় থেকে সদরঘাট রোড) সড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কোতোয়ালী ও নিউ মার্কেট মোড়ের যানজট নিরসন ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে সূত্র বলেছে, প্রকল্পের আওতায় ৬২০ মিটার দীর্ঘ ও ১১ হাজার ৩৩৯.৮০ বর্গমিটার রাস্তা সম্প্রসারণ করা হবে।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এবং যানজট কবলিত মোড় হিসেবে চিহ্নিত অক্সিজেন মোড়ে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণসহ অক্সিজেন থেকে কুয়াইশ সংযোগ সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আলাদা একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে। অচিরেই ডিপিপি প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে সিডিএ সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় ৪.৮৩৫ কিমি দীর্ঘ ও ২৭.৫ মিটার প্রস্থ করে সড়কটি সম্প্রসারণ করা হবে। অক্সিজেন সড়কটিকে বর্তমানের প্রস্থ ৬০ ফুটকে ৯০ ফুটে উন্নীত করা হবে।
সিডিএ নগরীর অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের আলাদা একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নগরীর কাজির দেউড়ি থেকে গনি বেকারি রোড, লাভলেইন থেকে চেরাগী পাহাড় মোড় এবং বৌদ্ধ মন্দির থেকে সিনেমা প্যালেস রোডসমূহ সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে শহরের ইনার সার্কুলার রোডের মধ্যবর্তী এলাকাসমূহে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এই তিনটি সড়কের সম্প্রসারণ কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় কাজির দেউড়ি থেকে গনি বেকারি রোডের ১.৩৯৫ কিমি দৈর্ঘ্য ও ১৮.৩০ মিটার প্রস্থ, লাভলেইন থেকে চেরাগী পাহাড় মোড় পর্যন্ত ০.৮২৯ কিমি দৈর্ঘ্য ও ৫.১৫.২৫ মিটার প্রস্থ রাস্তা ও বৌদ্ধ মন্দির থেকে সিনেমা প্যালেস রোডের ০.৮২১ কিমি দৈর্ঘ্য ও ১৮.৩০ মিটার প্রস্থের মোট ৩.০৪৫ কিমি রাস্তা সম্প্রসারণ করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে এবং অচিরে ডিপিপি প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সিডিএ অনেক বছর কোনো আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবাসন সমস্যা নিরসনে বে পার্ল নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গা এলাকায় ১৯.৫৫ একর জমিতে বিভিন্ন আকারের প্লট নির্মাণ করে জনগণকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ডিপিপি। অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। প্রকল্পটি লাভজনক হবে কিনা তা নিয়ে মন্ত্রণালয় কিছুটা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
একইভাবে বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন ‘নিসর্গ আবাসিক এলাকা’ নামে আলাদা একটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সিডিএ। বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন এলাকাটিতে ১১৩.৮৯ একর ভূমির উপর এলাকাটি গড়ে তোলার ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। ‘ডেভেলপমেন্ট অব ফতেয়াবাদ নিউ টাউন ইন চট্টগ্রাম’ শীর্ষক আলাদা একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সিডিএ। প্রকল্পটির মাধ্যমে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত অকৃষি উঁচু জমিতে পাহাড় সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে পাহাড়ের পাদদেশে জলাধার নির্মাণ, মূল শহরের উপর চাপ কমানো, ইকোলজিক্যাল এবং টেকসই পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে আধুনিক সুযোগ–সুবিধা সম্বলিত সেলফ সাসটেইনড একটি নতুন শহর স্থাপনের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে অন্তত ৫ লাখ লোকের আবাসন সুনিশ্চিত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হয়েছে।
উপরোক্ত ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নাগরিক জীবন ভিন্নমাত্রা পাবে মন্তব্য করে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নুরুল করিম আজাদীকে বলেন, আমরা প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছি। প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে জানতে পেরে মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। তিনি বেশ কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। তিনি প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে যেভাবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তাতে আমি আশাবাদী। মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পগুলো ঠিকভাবে অনুমোদিত হওয়ার পথে খুব বেশি বাধা নিশ্চয় থাকবে না।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, যে ১০টি প্রকল্পটি নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি সেগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম মহানগরীর নগরজীবন গতিশীল হবে। একটি বাসযোগ্য এবং মানসম্পন্ন শহর হিসেবে এই নগরীকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।














