পবিত্র রমজান এলেই চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ যেন পরিণত হয় ভ্রাতৃত্ব আর সমপ্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায়। ধনী–গরিব, ব্যবসায়ী–শ্রমজীবী থেকে শুরু করে পথচারী কিংবা ছিন্নমূল–সবাই এক কাতারে বসে একসঙ্গে ইফতার করেন এখানে। রমজানের প্রথম দিনেই তিন হাজারেরও বেশি রোজাদারের অংশগ্রহণে মসজিদ প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে ইফতারের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে।
আসরের নামাজ শেষ হতেই মসজিদের বারান্দার দুই পাশে মুখোমুখি হয়ে লম্বা সারিতে বসে পড়েন মুসল্লিরা। মসজিদের মাইকে ভেসে আসে ধর্মীয় বয়ান। এর মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবকেরা শুরু করেন ইফতার বিতরণ। মাগরিবের আজান ধ্বনিত হতেই সবাই একসঙ্গে ইফতার শুরু করেন।
মসজিদের খতিবের একান্ত সচিব মো. হাসান জানান, আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব ছাইয়্যেদ মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল–মাদানির উদ্যোগে ২০০১ সালে মক্কা–মদিনার আদলে ছোট পরিসরে এই ইফতার আয়োজন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি বাড়তে বাড়তে এখন তা বৃহৎ আয়োজনের রূপ নিয়েছে। রমজানের প্রথম দিনে প্রায় তিন হাজার মুসল্লি এখানে ইফতার করেন। আর রোজার দশদিন পেরোলে সেই সংখ্যা বেড়ে চার থেকে পাঁচ হাজারে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, প্রতিদিনের ইফতার আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয় একদিন আগেই। আট থেকে দশজন বাবুর্চি ও তাদের সহকারীরা আগের দিন আসরের সময় ছোলা ও খেসারি ভিজিয়ে রাখেন। ভোর থেকেই শুরু হয় বেগুন, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, আদা ও ধনেপাতা কাটার কাজ। এরপর আসরের আজান পর্যন্ত চলে ভাজাপোড়ার ব্যস্ততা। এ সময় ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি ও আলুর চপ প্রস্তুত করা হয়। আসরের পর বড় বড় ড্রামে তৈরি করা হয় শরবত। সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা রোজাদারদের হাতে প্লাস্টিকের গ্লাস ও প্লেটে ইফতার তুলে দেওয়া হয়। কোথাও পাঁচ থেকে দশজনের জন্য একসঙ্গে বড় থালাও পরিবেশন করা হয়। কেউ সারিতে, কেউ গোল হয়ে বসে ইফতার করেন। রমজানের প্রথম দিনেই মাসব্যাপী এই ইফতার মাহফিলের উদ্বোধন করা হয়। মসজিদের খতিব আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরি আল মাদানির সভাপতিত্বে এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আন্দরকিল্লা মুসল্লি পরিষদের সেক্রেটারি ও চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম–৯ (কোতোয়ালী–বাকলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, মুসল্লি পরিষদের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ও জয়নাল আবেদীন, টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান এবং সাবেক সেক্রেটারি আহমদ হোসাইনসহ অনেকে।
মুসল্লি পরিষদের সদস্য হাসান মুরাদ জানান, ইফতার সামগ্রী দানকারীরা বেশিরভাগই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তারা প্রয়োজনীয় উপকরণ মসজিদে পৌঁছে দেন। সেগুলো সংরক্ষণ করে প্রতিদিন বাবুর্চিদের মাধ্যমে রান্না করে পরিবেশন করা হয়।
মসজিদ সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর রমজানে এখানে বড় পরিসরে ইফতার আয়োজন করা হয়। রোজার শুরুর দিকে নিয়মিত আড়াই থেকে তিন হাজার মানুষ ইফতার করেন। রমজানের শেষ দিকে সেই সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। ছোট প্লেট কিংবা বড় একটি প্লেট ঘিরে বসে একসঙ্গে ইফতার করার এই দৃশ্য অনেকের কাছেই ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মসজিদের মূল ভবন ১৮ গজ দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ গজ প্রশস্ত। পশ্চিম দেয়াল পোড়ামাটির ইটে নির্মিত এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের। ছাদে রয়েছে একটি বড় ও দুটি ছোট গম্বুজ। চারটি অষ্টভুজাকৃতি বুরুজের মধ্যে পেছনের দুটি এখনও টিকে আছে, যা মসজিদের ঐতিহাসিক সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।











