মিয়ানমারের সাথে বৈধ আদমানি–রপ্তানি ব্যবসা করে সরকারের রাজস্ব আদায়ের বড় খাত টেকনাফ স্থলবন্দর। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির বাধা ও নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে আদমানি–রপ্তানি ব্যবসা বন্ধ থাকায় অচল হয়ে পড়েছে দেশের সর্বদক্ষিণের এই স্থলবন্দরটি। এতে দেড় শতাধিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারে আটকে আছে। একই সঙ্গে সরকার মাসে প্রায় ১২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এছাড়া বন্দরকেন্দ্রিক প্রায় ৪০০ আমদানি–রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা সংকটে পড়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বন্দরের এই দুরবস্থা নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রুত বন্দরের অচলাবস্থা কাটিয়ে তোলার দাবি তুলেছেন। এই প্রেক্ষিতে সমপ্রতি কক্সবাজারে এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে পণ্যবোঝাই ট্রলার বা জাহাজ নাফ নদীতে ঢুকলে আরাকান আর্মি গুলি চালানো বা জাহাজ আটক করার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের ৩ মার্চ থেকে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি–রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। প্রায় এক বছর পার হতে চললেও বাণিজ্য চালু হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দক্ষিণের একমাত্র এই স্থলবন্দরটি প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। বন্দরে নেই কোনো পণ্য, নেই শ্রমিকের কোলাহল কিংবা ট্রাকের সারি। নাফ নদীর তীরের জেটিতেও নেই পণ্যবোঝাই ট্রলার বা জাহাজ। বন্দরের বাইরের সড়কের দোকানপাটও অধিকাংশ বন্ধ।
একসময় কাঠের ট্রলার ও ছোট জাহাজে করে বঙ্গোপসাগর এবং নাফ নদী পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে কাঠ, হিমায়িত মাছ, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ, সুপারিসহ নানা পণ্য আসত টেকনাফ স্থলবন্দরে। বন্দরের জেটিতে প্রতিদিন ভিড়ত ৩০–৪০টি পণ্যবোঝাই জাহাজ। সেখান থেকে শত শত ট্রাকে এসব পণ্য পাঠানো হতো চট্টগ্রাম, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো বন্দর এলাকা।
টেকনাফ স্থলবন্দর আমদানি–রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, দীর্ঘদিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫০ ব্যবসায়ী চরম সংকটে পড়েছেন। তাদের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও সিত্তে বন্দরে আটকে আছে। এতে ব্যবসায়ী, শ্রমিকরা চরমভাবে ক্ষতির মুখে রয়েছেন। আর সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি বলেন, আটকে থাকা পণ্যের মধ্যে কাঠ, সুপারি, বরই, তেঁতুল, হিমায়িত মাছ ও শুঁটকি রয়েছে। দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকার কারণে শত কোটি টাকার পেঁয়াজ ও আদা ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, সীমান্ত চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য চালু করা প্রয়োজন। এ জন্য মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও সমন্বয় জরুরি।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩ মার্চ মিয়ানমার থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে ৬৭৫ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছিল প্রায় ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ৩ হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন আলু, বিস্কুট, পানীয় ও প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল।
শুল্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এক বছরে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
স্থলবন্দর পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেড টেকনাফের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এক বছর ধরে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় তাদেরও (বন্দর কর্তৃপক্ষ) মাসে ৩০ লাখ টাকা করে গচ্চা যাচ্ছে।
অন্যদিকে এই স্থলবন্দর বন্ধ থাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাচালান চক্র। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অন্তত ৩৩টি স্থান দিয়ে নিয়মিত পণ্য পাচার হচ্ছে। বিজিবি ও কোস্টগার্ড জানায়, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত দেড় মাসে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৪৫টি অভিযান চালিয়ে ৩০০ কোটি টাকার বেশি মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কারণে এত দিন বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এখন এটি চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
দুই দেশের সীমান্ত চোরাচালানকে নিরুৎসাহিত করতে ১৯৯৫ সালে ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ–মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়েছিল। শুরুর কয়েক বছর চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা গতি হারিয়ে ফেলে। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার–৪ আসনের (উখিয়া–টেকনাফ) সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চোরাচালান বন্ধ করতে অচল সীমান্ত বাণিজ্য চালুর চেষ্টা চলছে।












