উত্তাল প্রতিবাদ ‘নো কিংস-নো ওয়ার’!

এমরান হোসাইন | বৃহস্পতিবার , ২ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ

যে কোন জায়গায় অন্যায় সর্বত্র ন্যায় বিচারের জন্য হুমকি। ১৯৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য আলাবামার উত্তরমধ্য অঞ্চল বার্মিংহামে অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ মিছিল থেকে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। জেল থেকে লেখা চিঠিতে এই উক্তিটি করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে “নো কিংসনো ওয়ার” অহিংস উত্তাল আন্দোলনযেন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে আরেকবার মার্টিন লুথার কিং কে স্মরণ করিয়ে দিলেন।

গত শনিবার উত্তাল আন্দোলনের ঢেউ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে আলাস্কা হয়ে মারলাগোর কাছের জনপদে আছড়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ছোটছোট শহরে। হোয়াইট হাউস ও তার বাইরের স্বৈরাচারী শাসক, অজনপ্রিয় যুদ্ধ, ক্রমবর্ধমান অভিবাসন দমননীতি, গর্ভপাতের অধিকার হরণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পদদলিত করার প্রতিবাদে আমেরিকার ৫০ রাজ্যের কোটি মানুষ নেমে এসেছিল রাজপথে। ক্যানসাস রাজ্য মানে ট্রাম্প স্টেট। এ রাজ্যে নির্বাচনী ইতিহাসে ডেমোক্রেট দল বিজয়ী হতে পারেনি। ১৯৩০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে দীর্ঘ হারার রেকর্ডগুলোর একটি। তবুও শনিবার এ রাজ্যের সবচেয়ে বড় শহর “উচিটা” ডাউন টাউনে এককিলোমিটার রাস্তাজুড়ে শুধু “নো কিংস”। নানা রংয়ের প্লেকার্ড, ফেস্টুন, হাতে আঁকা এফওয়ার্ড বাক্য নিয়ে নেচেগেয়ে দিনভর স্লোগানেগানে হাজারো মানুষের জয়ধ্বনি। চোখে দেখা এ আন্দোলনে বিক্ষোভে অংশ নেয়া ৯০শতাংশ পঞ্চাশোর্ধ। তবে মঞ্চে নেতৃত্বে ছিলেন যুবকযুবতি। আন্দোলন চলাকালিন সময়ে রাস্তার গাড়ি চলাচলে কোন প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়নি। চলতি পথে রাস্তায় গাড়ি থেকে হর্ণ দিয়ে নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন শতশত মানুষ। কি এক অদ্ভূত গণতান্ত্রিক আন্দোলন। বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ট্টাম্পনিজ দেশের রাজপথে সাধারণ মানুষের সরব প্রতিবাদ। তবে অনেকে এ আন্দোলনকে অকার্যকর এবং সাজানো বলে উড়িয়ে দেন। এর পেছনে বামপন্থি বা বাইরের কোন প্রভাব রয়েছে বলে নোনা সোস্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজপথে চোখ ধাঁধানো এ প্রতিবাদকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি নিয়ে সমাজে বিদ্যমান গভীর বিভাজনই ষ্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। অনেকের মতে এটি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এর বিপিরীতে ট্রাম্পের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি রয়েছে পূর্ণ আস্থা। রাস্তার দুধারে সকাল ১০টা থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত যেন একজন স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী মানুষের তীব্র প্রতিবাদ। রংবেরংয়ের ব্যানারের ফাঁকে চোখ পড়লো বিক্ষোভে অংশ নেয়া এক নারীর হাতে ফেস্টুনে লেখা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের একটি বিখ্যাত উক্তি-‘যে কোনও স্থানের অবিচার সর্বত্র ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি’ অর্থাৎ যেকোনো অবিচার সকলকেই প্রভাবিত করে এবং তা উপেক্ষা করা প্রত্যেকের অধিকার ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে। এমন কোন বিক্ষোভকারী ছিল না; যার হাতে অন্তত:এক টুকরো হাতে লিখা কাগজের ফেস্টুন ছিল না। প্রতিটি হাত বিক্ষোভের হাতে মুষ্টিবদ্ধ ছিল। এক নারী নাম তার লাইকা। তার হাতে ফেস্টুনে লিখাগণতন্ত্রে কিং বলে কিছু নেই। তাই আমেরিকাতেও কোন কিং চাইনা।আবার অনেকের হাতে “নো ওয়ার”, চুপচাপ প্লেকার্ড হাতে বসা এক মধ্যবয়সীএতে লিখা রয়েছেইরান সংঘাত থেকে দূরে থাক। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিং তুমি ফিরে যাওএ ধরনের ব্যানারও দেখা গেছে। আয়োজক সংগঠন ডিফেন্ড ডেমোক্রেসির তৎপরতা চোখে পড়ার মত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মঞ্চে বিক্ষোভে অংশ নেয়া যে কেউ বক্তব্য রাখার সময় ছিল উন্মুক্ত। সবমিলে এক অদ্ভুত ভাল লাগা সরব আন্দোলন। নেই কোন হিংসাত্মক ভাঙচুর। যা স্মরণ করিয়ে দেয় ক্যাপিটাল হিলে হামলার কথা। এটি ছিল আমেরিকার শতশত বছরে ঐতিহ্য গণতন্ত্রের অলংকার।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাঁশখালী সমুদ্র সৈকত: নিসর্গের নীরব জাদুঘর
পরবর্তী নিবন্ধশিশুদের মনোজগতে যুদ্ধের প্রভাব ও প্যারেন্টিং