ইরানে ব্যাপক হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানের রাজধানী তেহরানসহ ৩২টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ২০টি প্রদেশে হামলা করা হয়েছে। হামলায় ইরানে ২০১ জন নিহত ও ৭৪৭ জন আহত হয়েছে বলে রেড ক্রিসেন্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের হোরমোজগান প্রদেশে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় ৮৫ জন শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছে বলে রয়টার্স সূত্রে জানা যায়। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের নিহতদের খবর নিশ্চিত করেননি। গতকাল শনিবার ভোরে শুরু হওয়া এই অভিযানে ইরানের শীর্ষ স্থানীয় সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই তথ্য জানিয়েছে। হামলার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। খবর বিডিনিউজ ও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।
এদিকে ইরানও ইসরায়েলসহ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করেছে। ইরানের ইসলামি রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এর সাথে সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, কৌশলগত গুরুত্বের কথা চিন্তা করে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি ইরানের দক্ষিণে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত একটি নৌ চলাচলের পথ বা চ্যানেল। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আইআরজিসির পক্ষ থেকে জাহাজগুলোকে বার্তা পাঠানো হয়েছে যে, যে কোন ধরনের জাহাজকে নতুন করে প্রণালিটি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন বা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, তারাও একাধিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই সর্তকবার্তার কথা জানতে পেরেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টানেল। বিশ্বে উৎপাদিত তেল এবং গ্যাসের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহণ করা হয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া বেশকিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সাইরেন বেজে ওঠে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শত্রু চূড়ান্ত পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। এতে আরও বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন সম্পদ ও স্থাপনাকে ইরানের সেনাবাহিনীর জন্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা সাধারণ জনগণকে ‘হোম ফ্রন্ট কমান্ডে’র নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার অনুরোধ করছি। বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী বর্তমানে সম্ভাব্য হুমকিগুলো আকাশেই রুখে দিতে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পাল্টা হামলা চালাতে সক্রিয় রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্িছদ্র নয় উল্লেখ করে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী পুনরায় সতর্ক করে বলেছে, ‘প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবসময় সব বিপদ রুখতে সক্ষম নাও হতে পারে। তাই এই মুহূর্তে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশাবলি অনুসরণ করা অপরিহার্য।’
অপরদিকে হামলার পর এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে বড় ধরনের হামলা শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট শিল্প ধ্বংস করা হবে এবং নৌবাহিনী ‘পুরোপুরি নিশ্চহ্ন’ করে দেওয়া হবে। ইরানের সামরিক বাহিনীকে তিনি ‘দায়মুক্তি অথবা নিশ্চিত মৃত্যু’–এর মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সাধারণ ইরানিদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল ক্যাটজ অবশ্য এটিকে ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, এই হামলায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান নিরাপদ আছেন। অন্যদিকে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তেহরানের কেশভারদুস্ত ও পাস্তুর এলাকায় সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেন, ‘আমি নিজের চোখে দুইটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যভেদ করতে দেখেছি। প্রথমে শব্দ শুনে ভেবেছিলাম যুদ্ধবিমান।’ এএফপি সাংবাদিকরা শহরের কেন্দ্রে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং ধোঁয়ার দুটি বড় কুন্ডলী দেখেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়েছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। হামলার পর ইরান, ইরাক ও ইসরাইল তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস নাগরিকদের আশ্রয় নিতে আহ্বান জানায়।
এদিকে, জেরুজালেমে সাইরেন বাজানো হচ্ছে ও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ মোবাইলে নাগরিকদের সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর.ফোর্ড ইসরাইল উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠকের একদিন পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের যা দরকার, তা দিতে প্রস্তুত নয় ইরান।’ তবে ওই আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের প্রতিনিধি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি জানান, ইরান ইউরেনিয়াম মজুত শূন্যে নামাতে সম্মত হয়েছে। তেহরান তাদের বর্তমান মজুত জ্বালানিতে রূপান্তর করবে বলেও জানান তিনি। গণবিক্ষোভ দমনে কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পর এই হামলা চালানো হল। ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরান নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সম্মত হয়। যদিও ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে সেটি বাতিল করেছিলেন।












